জেলার সংবাদ

হাওরে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির কথা স্বীকার

ঢাকা,০৫ মে, (ডেইলি টাইমস ২৪):

সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মহাপরিচালক ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবসহ  (প্রশাসন) পদস্থ ৭ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত টানা আড়াই ঘণ্টা তাদের দুদক কার্যলয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মুনীর চৌধুরী ও পরিচালক বেলাল হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের টিম তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুদক মহাপরিচালক মুনীর চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, হাওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির কথা স্বীকার করেছেন পাউবোর মহাপরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তারা।

বৃহস্পতিবার যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তারা হলেন- পানি উন্নয়ন বোর্ডের  মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর কবির, অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আবদুল হাই আল বাকি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) মো. খলিলুর রহমান, পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (নকশা শাখা) হারুনুর রশিদ।

এছাড়া ২ মে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সিলেটের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৗশলী আবদুল হাই, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম সরকার, সম্প্রতি সুনামগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার ও বরখাস্ত হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী আফসার উদ্দিনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধে ফাটল ও কোথাও বাঁধ ভেঙে হাওর তলিয়ে যাওয়ার পেছনে পাউবোর স্থানীয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল একটি নির্দেশনা দেন।

চেয়ারম্যানের নির্দেশমতো দুদকের একজন মহাপরিচালক অনিয়ম দুর্নীতির কারণে সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষা বাঁধে ভাঙনের বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি প্রতিবেদন চান। কাদের দুর্নীতির কারণে হাওরের বাঁধ ভেঙে কৃষকের সর্বনাশ হচ্ছে সে বিষয়ে প্রতিবেদন চাওয়ার পর মন্ত্রণালয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একটি কমিটি করার জন্য বলে।

পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড গত বছর এপ্রিলেই দুই সদস্যের একটি কমিটি করে। ওই কমিটির তৈরি করা প্রতিবেদনটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে দুদকে আসে। কিন্তু তাতে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বাঁধ ভেঙে কৃষকের ফসলহানির বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলা হয়, বন্যা, আগাম বৃষ্টি ও ইঁদুরে বাঁধ কেটে দেয়ার কারণে হাওরে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রধান কার্যালয় থেকে গঠিত ওই তদন্ত কমিটি দুর্নীতির বিষয়টি গোপন করায় প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দুদকে তলব করা হয় বলে জানা গেছে ।

বৃহস্পতিবার দুদকের কর্মকর্তাদের জেরার মুখে পাউবোর মহাপরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ওই প্রতিবেদনে তারা সঠিক তথ্য দিতে পারেননি।

হাওরের বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি হলেও তারা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। এটা তাদের ব্যর্থতা। এমনকি হাওরের বাঁধ নির্মাণ কাজের মনিটরিংয়েও তাদের ব্যর্থতা ছিল। সময়মতো তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। দুদক চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে এক বছর আগে নেয়া পদক্ষেপের পর প্রতিবেদন পাঠাতে এক বছর কেন দেরি হল- এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি পউবোর মহাপরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তারা।

দুর্নীতির বিষয়টি গোপন করে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকার কারণ হিসেবে ইঁদুরে বাঁধ কেটে ফেলা বা আগাম বৃষ্টির কথা কেন দুদকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হলো- এ প্রশ্নেরও কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি কর্মকর্তারা।

দুদক টিমের একজন কর্মকর্তা জানান, পাউবো এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এক্ষেত্রে তাদের ভুল হয়ে গেছে। এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৬ সালে হাওর অঞ্চলের দুজন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পরও ২০১৭ সালে কেন তাদের কাজ দেয়া হল এমন প্রশ্নে ৭ কর্মকর্তাই চুপ হয়ে যান।

দুদক থেকে বের হয়ে যাওয়ার পথে পাউবো’র মহাপরিচালকের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, কী কী বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি বলেন, যা বলার দুদক টিমকে বলেছি। এর বাইরে আর কিছু বলার নেই।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুদক মহাপরিচালক (প্রশাসন) মুনীর চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, হওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন পাউবোর ডিজি ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তারা স্বীকার করেছেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজ আদায় করা ও কাজের বিষয়ে নজরদারির বিষয়টি তারা সঠিকভাবে করতে পারেননি। তারা তাদের ব্যর্থতা ও প্রকল্পের কাজের দুর্নীতির ঘটনা স্বীকার করে নিয়েছেন।

এ পর্যায়ে এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মুনীর চৌধুরী বলেন, তাদের বক্তব্য আমরা এখন পর্যালোচনা করব। আরও তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে। সেগুলো পর্যালোচনা শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যস্থা নেয়া হবে।

দুদকের পরিচালক বেলাল হোসেনের নৃতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম ১৯ এপ্রিল থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত হাওর এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করেন। তারা সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আসেন। তার ভিত্তিতে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনও তৈরি করেন। তাতে দুর্নীতি অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্তত ২০ জন কর্মকর্তার বিষয়ে ধারণা দেয়া হয়।

এর বাইরে পাউবো’র মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর কবির, অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আবদুল হাই আল বাকি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) মো. খলিলুর রহমান, পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (নকশা শাখা) হারুনুর রশিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নতুন করে প্রতিবেদনে যুক্ত হচ্ছে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button