জাতীয়

নির্দয় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড, বিপর্যয়ের কারণ ‘ফল বিভ্রাট’?

ঢাকা,০৬ মে, (ডেইলি টাইমস ২৪):

নাজমুল আলম অর্ণব, কুমিল্লা জিলা স্কুলের বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সব বিষয়ে জিপিএ ৫ পেলেও রসায়নে সে ফেল করেছে। ইন্টারনেট থেকে ফলাফল বিবরণী নিয়ে দেখা গেলো, সে রসায়ণে ৫৭ নম্বর পেয়েছে। এর মধ্যে নৈব্যর্ত্তিকে ২৩, ব্যবহারিকে ২৫ নম্বর পেলেও লিখিত পরীক্ষায় মাত্র ৯ পেয়েছে। অথচ লিখিত পরীক্ষায় এটি তার কাঙ্ক্ষিত ফল নয়। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক রাশেদা আখতারও এই ফল মানতে নারাজ।

একই অবস্থা ওই স্কুলের মেধাবী ছাত্র আমিনুর রশিদ রাফির। সব বিষয়ে জিপিএ ৫ পেলেও রসায়নে সে ৫৭ নম্বর পেয়ে ফেল করেছে। অপরদিকে ব্রাহ্মণপাড়ার মালাপাড়া বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ের কামরুল হাসান কৃষি শিক্ষায় ৭২ নম্বর পেয়েও ফেল করেছে। এই ৭২ নম্বরের মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৪০, ব্যবহারিকে ২৫ এবং নৈব্যর্ত্তিকে ৭ পেয়েছে। অথচ নৈব্যর্ত্তিকে ১ নম্বর সহায়ক নম্বর পেলে ওই বিষয়ে পাস করত জিপিএ ৫ এর একটু কম নম্বর পেয়ে। এ রকম ১ বা ২ নম্বরের জন্য কুমিল্লা বোর্ডের অনেক পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। খাতা মূল্যায়ণের ক্ষেত্রে চরম কড়াকড়ি, কোনো কোনো পরীক্ষকের ভুলের পাসাপাসি ১ নম্বর যোগের অনুকম্পা না দেখানোয় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে, পরীক্ষকরা উত্তরপত্র ত্রুটিমুক্তভাবে মূল্যায়ণ করতে গিয়ে তা স্বাভাবিকভাবেও করতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে অভিভাবকদের। তারা বলছেন, ১ বা ২ নম্বরের জন্য কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের নির্দয় আচরণের ফলে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের মূল কারণ। তা ছাড়া প্রাপ্ত নম্বরের বৃত্ত যথাযথভাবে ভরাট না করার কারণেও অনেক শিক্ষাথীর ফল পাল্টে গেছে। কিন্তু এই দায় নিতে নারাজ কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বাইরে তাদের করার কিছু ছিল না বলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ।

এ বছর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে গ্রেড পয়েন্টের সাথে প্রাপ্ত নম্বর চলে আসায় পূর্ণাঙ্গ ফলাফল দেখে অনেক শিক্ষার্থীই শিক্ষা বোর্ডের নির্দয়তার বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে অভিযোগ করে কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাশেদা আক্তার বলেন, এ বছর তার স্কুল থেকে ৩ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে। তাদের মধ্যে দুজনের ফেল করার প্রশ্নই আসে না। অপরজন একটু খারাপ ছিল। কিন্তু কেন এমন হলো বুঝলাম না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের এসএসসির ফল প্রকাশের পর অন্তত ১২ হাজার পরীক্ষার্থী তাদের খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছিল্। তাদের মধ্যে ৩ শ ৬৫ জনের ফল পাল্টে দিয়া হয়েছিল। ১৭ জন জিপিএ ৫ পেয়েছিল। বাকিদের ফল আগেও চেয়ে ভালো হয়েছিল।

পুনঃনিরীক্ষণের পর পরীক্ষার্থীদের ফলাফল ভালো হলেও প্রাপ্য ফল না দেয়ায় কোন পরীক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ বলেন, ফল বিভ্রাটের জন্য মূলত পরীক্ষকরা দায়ী। এ জন্য আমরা ব্যবস্থাও নিয়েছি। কাউকে আর খাতা দেখতে দেওয়া হয়নি। কাউকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি, বা কেটে নেওয়া হয়েছে। আরো কঠোর ব্যবস্থা নিলে তো পরীক্ষক পাবো না।

গত ৪ মে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। পাসের হার মাত্র ৫৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। এর আগের বছর যেখানে পাসের হার ছিল ৮৪ শতাংশ। ফলাফল এক ধাক্কায় এত নিচে নেমে আসার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মাত্র দুটি বিষয়ে ব্যর্থতা। রেকর্ডকৃত শিক্ষার্থীদের ডুবিয়েছে ইংরেজি ও সাধারণ গণিতের ফলাফল। যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে সার্বিক পাসের হারে। ফল প্রকাশের পর গত দুই দিনে শহরের কম্পিউটার দোকানগুলোতে অকৃতকার্য পরীক্ষাথীরা হুমড়ি খেয়ে খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন জমা দিচ্ছে অনলাইনে। দুই দিনে কয়েক হাজার আবেদন জমা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এ বছর কেবল গণিতেই ফেল করেছে ৩৪ হাজার ৬৮৯ জন। আর ইংরেজি বিষয়ে উতরে যেতে পারেনি ২৫ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। কুমিল্লা বোর্ডে যেখানে মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থী ৭৪ হাজার ৮৬৮ জন সেখানে, গণিত ও ইংরেজিতেই ফেল করেছে ৬০ হাজার ২৯৫ জন। এ ছাড়াও বাংলায় ফেল করেছে প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী। মূলতঃ এ তিন বিষয়ের অকৃতকার্যতাই ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে কুমিল্লা বোর্ডের সার্বিক ফলাফলে। আর এসব বিষয়ে ১ থেকে ৩ নম্বরের জন্য ফেল করেছে সবচেয়ে বেশি।

ভয়াবহ ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে আরো একটি বিষয় উঠে এসেছে। তা হলো পরীক্ষার উত্তরপত্র ত্রুটিমুক্তভাবে মূল্যায়ন হয়নি। এ কারণটিকেও এবারের এসএসসি পরীক্ষার পাসের হার ও জিপিএ ৫ কমার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অবমূল্যায়ন ও অতিমূল্যায়ন রোধে বোর্ড বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রধান পরীক্ষকদের উত্তরমালা প্রণয়নের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান। প্রণীত নমুনা উত্তরমালার আলোকে উত্তরমালা মূল্যায়নে অন্যান্য পরীক্ষকগণকেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা প্রদান করা হয়। তবে উল্লেখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও বেশকিছু উত্তরপত্র একাধিক পরীক্ষক দিয়ে মূল্যায়ন ও পুনঃমূল্যায়ন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শহিদুল ইসলাম বলেন, এ বছর ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীরা খারাপ ফলাফল করেছে। ফলে এর প্রভাব মূল পাসের হারে গিয়ে পড়েছে।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ বলেন, সহায়ক নম্বর প্রদানের বিষয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের কোনো দোষ নেই। বোর্ড প্রশ্ন করে না, খাতাও কাটে না। বোর্ড শুধু মন্ত্রণালয়ের নিদের্শনা অনুযায়ী কাজ করে।

তিনি আরো বলেন, কোনো বোর্ডই অসীম ক্ষমতার অধিকারী নয়। বোর্ড রাষ্ট্রের একটা প্রতিষ্ঠান। বোর্ডকে সরাসরি তদারকি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে নিয়ম দেবে, তার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। পরীক্ষার খাতা কাটার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আমাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের ফেয়ার জাজমেন্ট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফেয়ার জাজমেন্ট মানে যে যা পাবে তাই দেওয়া হবে। এক নম্বরও বেশি দেওয়ার কোনো নির্দেশনা মন্ত্রণালয় থেকে ছিল না।

কায়সার আহমেদ বলেন, এইচএসসি’র মতো এসএসসিতে প্রথম পত্র ও দ্বিতীয় পত্র একসাথে পাস বিষয়ক কোনো বিষয় না থাকায় কো-অরডিনেশান নম্বর দিয়ে পাস করার কোনো সুযোগ নাই। প্রোগ্রামের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নাই। আমরা নিয়মের বাইরে যেতে পারি না। এজন্য বোর্ডকে নির্দয় বলেন অথবা ভাল বলেন, বোর্ডের গায়ে লাগবে না। মন্ত্রণালয় যদি আমাদের বলে, ৩২ পেলে এক নম্বর দিয়ে ৩৩ করে দাও। আমরা করব।

কম্পিউটারের ভুল হতে পারে কিনা এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাদের পদ্ধতিতে কোনো ভুল নেই। যিনি কম্পিউটারের কাজ করেন তিনি বারবার মনিটর করেন। কারণ ভুল হলে কন্ট্রোলার হিসেবে আমাকেই জবাবদিহি করতে হবে। কম্পিউটার যদি কোনো ভুল করে থাকে আমরা পুনঃনিরীক্ষণ করলে ভুলটা বেরিয়ে আসবে।

পাসের হার কমার বিষয়ে তিনি বলেন, পাসের হার ৩০ পারসেন্ট নামলে কন্ট্রোলার বা চেয়ারম্যানের কোনো লাভ নেই। কুমিল্লা বোর্ড ভালো করুক এটা আমরাও প্রত্যাশা করি।

পলিটিক্যাল নেতাদের বিষয়ে তিনি বলেন, টেস্টে পাস না করলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের ফাইনাল পরীক্ষার জন্য অনুমতি দিয়ে দেয়। ফলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করে। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব না থাকলেও গ্রামে এর প্রভাব খুব বেশি। রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আমার অনুরোধ, যে সকল শিক্ষার্থীরা টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না তাদের বিষয়ে আপনারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করে ফাইনাল পরীক্ষার জন্য বসাবেন না। এক বিষয়ে যারা অকৃতকার্য হবে তাদেরকে বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ, তারা হয়তো এক থেকে দেড় মাস সেই বিষয়ে অনুশীলন করলে পাস করে ফেলবে। কিন্তু যারা ২-৩ বিষয়ে ফেল করেছে তাদের বিষয়ে অনুরোধ করবেন না।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button