জেলার সংবাদ

দিল্লিবাসীই দেনা মেটাল সেই ট্যাক্সিচালকের

ঢাকা,১৩ মে, (ডেইলি টাইমস ২৪):

বিহারের বাসিন্দা দেভেন্দর কাপরি দিল্লিতে থাকেন পাঁচ বছর ধরে। বহু মানুষই তাকে রোজ দেখেন, কিন্তু এতদিন তার নাম ঘনিষ্ঠজন ছাড়া বিশেষ কেউ জানতেন না। জানার কথাও নয়, কারণ তিনি থাকেন দিল্লি বিমানবন্দরের কাছে একটা আধাগ্রামের ছোট্ট ঘরে – আরো দুজনের সঙ্গে। দিল্লির রাস্তায় কালো-হলুদ রঙের ট্যাক্সি চালান তিনি।

ঘটনার পর তার নাম শোনা যায় বেসরকারি এফএম স্টেশন রেডিও মির্চিতে আর জে নাভেদের কণ্ঠে। ঠিক কী করেছিলেন ওই ট্যাক্সিচালক, যার জন্য তার নাম রেডিওতে বলা হচ্ছিল?

এক প্রশ্নের জবাবে ট্যাক্সিচালক দেভেন্দর কাপরি বলেন, “এক যাত্রী দুটো ব্যাগ নিয়ে উঠেছিলেন বিমানবন্দর থেকে। একটা হোটেলের সামনে তিনি নেমে যাওয়ার পর একটি ব্যাগ পেছনের আসনে রয়ে যায়। ট্যাক্সি নিয়ে ওই হোটেলের কাছে ফিরে গিয়েও ওই যাত্রীকে আর খুঁজে পাইনি। মালিকের সঙ্গে কথা বলে থানায় যাই। ব্যাগ খুলে দেখা যায় গয়ান, ল্যাপটপ, আইফোন রয়েছে – পুলিশ বলে এগুলোর দাম প্রায় আট লাখ টাকার মতো হবে। ব্যাগের মধ্যেই একটি বিয়ের কার্ডে একটা মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। সেটাতে ফোন করে ওই যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ”

কাপরি বলেন, “কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানবন্দরে এসে নিজের ব্যাগ ফিরে পেয়ে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন ভারত শাসিত কাশ্মিরের রাজধানী শ্রীনগরের বাসিন্দা ওই যাত্রী। যাওয়ার সময় দেড় হাজার টাকাও দিয়ে গেছেন। ব্যাগটি রেখে দেওয়ার কথা আমার মাথাতে আসেইনি,”

এদিকে খবরটি স্থান পায় সংবাদমাধ্যমেও। সংবাদমাধ্যম জানতে পারে, দেভেন্দর কাপরি অত টাকা মূল্যের জিনিস পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি বিহারের গ্রাম থেকে পড়াশোনা ছেড়ে খুব কষ্ট করে দিল্লিতে রয়েছেন গত পাঁচ বছর ধরে, কারণ দুই বড় বোনের বিয়ের সময় বাবা যে টাকা ধার করেছিলেন, তার মধ্যে ৭০ হাজার টাকা প্রায় ৯ বছর পরও শোধ করতে পারেনি কাপরির পরিবার। এ খবর পত্রিকায় ছাপার পর সেটা চোখে পড়ে রেডিও মির্চির এক আর জে নাভেদ খান ও তার প্রযোজকের। তখনই তারা ঠিক করেন যে চেষ্টা করে দেখা যাক দেভিন্দরের দেনা শোধ করার জন্য টাকা যোগাড় করা যায় কিনা।

রেডিও মির্চির আর জে নাভেদ খান বলেন, “যেদিন অনুষ্ঠানে আসার জন্য দেভেন্দরকে আমরা ডেকেছিলাম, সেদিন সকালে একবার ঘোষণা করেছিলাম যে ওই ট্যাক্সিচালক স্টুডিওতে আসবেন। শ্রোতাদের মধ্যে যে যতটা পারেন যেন সাহায্য করেন সেই আবেদনও ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই ফোন আসা শুরু হয়ে যায়। অবশেষে. কাপরিকে যখন অনুষ্ঠানে নিয়ে আসা হয় তখনও কেউ ভাবতে পারেনি যে সত্যিই টাকাটা তোলা যাবে। আমি তো ওর সঙ্গে চা খাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেলেছিলাম যে দুপুরের মধ্যেই টাকাটা উঠে আসবে। ”

তবে অভাবনীয়ভাবে চল্লিশ মিনিটে মাত্র তিনবার ঘোষণার পরই প্রয়োজনীয় ৭০ হাজার টাকা উঠে আসে। শেষমেশ সাড়ে ১০টায় যখন টাকা জমা দেওয়ার সাইটটি বন্ধ করা হচ্ছে, তখন সেখানে ৯১ হাজার টাকা উঠে গেছে। সাধারণভাবে বড় মেট্রো শহরগুলোর বাসিন্দারা রাস্তাঘাটে অজানা অচেনা কাউকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন না। দুর্ঘটনায় পড়লেও অনেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যান। কিন্তু দেভেন্দর কাপরির জন্য অর্থ সংগ্রহে নেমে সেই ধারণাটা বদলে গেছে নাভেদ খানের।

কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের সাবেক বিভাগীয় প্রধান শমিত কর বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন সাধারণ মানুষের এই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কারণ। তিনি বলেন, “ওই ছেলেটি তার ডিউটিই করেছে ব্যাগটা ফেরত দিয়ে। কিন্তু এই যে নিজের অর্থের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও একটা পয়সাও সরিয়ে না রেখে মহত্বের পরিচয় দিয়েছে, কোনো সমঝোতা করেনি ব্যক্তি স্বার্থের সঙ্গে, সেটাই অনেকের মনে দাগ কেটেছে। সাধারণ মানুষ তো দৈনন্দিন জীবনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সমঝোতা করতে বাধ্য হচ্ছেন নিয়মিত। সেই সময় কেউ যখন মহত্ব দেখাচ্ছে সমঝোতা না করে, সেই ব্যাপারটিকেই সাধারণ মানুষ কুর্ণিশ করেছে দেনা মেটানোর টাকা যোগাড় করে দিয়ে। ”

দেভেন্দর কাপরি এখনো সংগৃহীত টাকা হাতে পাননি। টাকাটা পেয়ে দেনা শোধ করার পরও যে বাড়তি ২০ হাজার টাকা থাকবে, সেটা দিয়ে কী করবেন এখনও ভেবে উঠতে পারেননি তিনি। তবে একটা জিনিস যে কিনবেন, সেটা ঠিক করেই ফেলেছেন তিনি। গ্রামের বাড়িতে বছরে একবার করে গেলেই মা একটা বিশেষ শাড়ি আনতে বলেন দেভেন্দরকে। এবার সেপ্টেম্বর মাসে বাড়ি যাওয়ার সময় মায়ের জন্য সেই শাড়িটা নিয়ে যেতে হবে তাকে।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button