জাতীয়

ব্যাপক লোডশেডিংয়ে দুর্বিষহ জনজীবন

ঢাকা,২৬ মে, (ডেইলি টাইমস ২৪):

গ্রীষ্মের দাবদাহ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। কিন্তু গ্যাস সংকট, সঞ্চালন টাওয়ার ভেঙে পড়া এবং একযোগে অন্তত ১০টি বিদ্যুেকন্দ্রে সংস্কার কাজ চলাসহ বিভিন্ন কারণে চাহিদার বিপরীতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে পারছে না বিতরণ সংস্থাগুলো। বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গত দুই দিনে এ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৪২৮ থেকে ৯৭৯ মেগাওয়াট দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ ঘাটতির কবলে পড়েছে দেশ। গ্রাম ও মফস্বল শহরগুলোতে দিনে অন্তত ১২ ঘণ্টা এবং ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে এলাকাভেদে ২ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

গত এক সপ্তাহ ধরে সারাদেশে চলছে তীব্র দাবদাহ। প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ মানুষকে স্বস্তি দিতে পারত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্। কিন্তু উত্পাদন ঘাটতি ও সঞ্চালন-বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় বিদ্যুত্ না পেয়ে গরমে হাঁসফাঁস করা মানুষ হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন।

সার্বিক বিদ্যুত্ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, শনিবার নাগাদ বিদ্যুত্ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ফলে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, তা ঠিক হয়ে যাচ্ছে। রমজানে বিদ্যুত্ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে রমজানে বিদ্যুতের চাহিদা আরো বেড়ে গেলে আবারও ঘাটতি হতে পারে বলে তিনি শঙ্কাও প্রকাশ করেন। এর আগে গত  ২২ মে চারদিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। আজ শুক্রবার সেই সময়সীমা পার হচ্ছে।

ক্ষোভ বাড়ছে

বিদ্যুত্ না পেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কয়েকটি স্থানে বিদ্যুেকন্দ্র ও অফিসগুলো ঘেরাও করা হয়েছে। বিদ্যুত্ না পেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার চাঁদপুরের কচুয়ায় স্থানীয় বিদ্যুত্ অফিস ঘেরাও করে জনগণ। সেখানে বিক্ষুব্ধরা বলেন, ২৪ ঘণ্টার ২২ ঘণ্টাই বিদ্যুত্ থাকে না ওই এলাকায়। বুধবার নোয়াখালীর হাতিয়ায় বিদ্যুত্ অফিস ও কেন্দ্র ঘেরাও করে জনগণ। পুলিশের হস্তক্ষেপে জনগণ ঘেরাও কর্মসূচি প্রত্যাহার করলেও ক্ষোভ প্রকাশ অব্যাহত রয়েছে। গত ১৯ মে শরীয়তপুরের সদর উপজেলার চন্দ্রপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক সমাবেশে স্থানীয় জনগণ ঘোষণা দেন- বিদ্যুতের সেবার মান না বাড়লে বিল পরিশোধ করবেন না তারা। চন্দ্রপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এক ঘণ্টাও বিদ্যুত্ পাওয়া যাচ্ছে না।

দুর্বিষহ দুর্ভোগে জনজীবন, শিল্পকারখানায় স্থবিরতা

বিদ্যুত্ না থাকায় সারাদেশে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। স্বাভাবিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে। বিদ্যুত্ না থাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি সংরক্ষণ করতে পারছেন না শহরাঞ্চলের অনেক মানুষ। ফলে বাসাবাড়িতে ও ছোট অফিসগুলোতে পানির অভাবে দৈনন্দিন জরুরি কাজও সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ঢাকার মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মগবাজার, পুরান ঢাকা, মিরপুর, ফার্মগেট, রাজাবাজার, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার এলাকায় তীব্র পানির সঙ্কট তৈরি হয়েছে। রিকশাচালকসহ বিভিন্ন শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষ ঘরের বাইরে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কাজের ফাঁকে কিংবা সারাদিন কাজশেষে রাতে বাসায় ফিরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ না পেয়ে দুর্ভোগে পড়ছেন তারা। বিভিন্ন জেলায় সদর হাসপাতালসহ গ্রামীণ চিকিত্সাকেন্দ্রগুলোতে লোডশেডিংয়ের কারণে চিকিত্সা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে ইত্তেফাকের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।

যে কারণে লোডশেডিং বেড়েছে

পিডিবি ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, গত ১ মে উচ্চক্ষমতার আশুগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার ভেঙ্গে গিয়ে বিদ্যুত্ বিপর্যয় ঘটে। ওই লাইনটি স্বাভাবিক করতে আরো অন্তত ৫ মাস সময় লাগবে। এ কারণে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের ৩৮টি জেলায় বিদ্যুত্ নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হচ্ছে। ওই টাওয়ার ভাঙায় মেঘনাঘাট ও বিবিয়ানায় উত্পাদিত প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ গ্রীডে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আবার এক যোগে প্রায় ১৫টি বিদ্যুেকন্দ্র সংস্কার কাজে যাওয়ায় সংকট বাড়ে। যদিও এ কেন্দ্রগুলো শীতকালে সংস্কার করার কথা ছিল। গতকাল পর্যন্ত ৮টি কেন্দ্র সংস্কারাধীন ছিল। আবার গ্যাস সংকটের কারণে ৯৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যাচ্ছে না। আর দেশের বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর স্থাপিত ক্ষমতা ১৩ হাজার ১৭৯ মেগাওয়াট হলেও সক্ষমতা কমে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ হাজার। তবে এ পরিমাণ বিদ্যুত্ মাঝে মাঝে উত্পাদন সম্ভব। নিয়মিত ৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উত্পাদন সম্ভব নয়।

যা বললেন বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী

গতকাল বিদ্যুত্ সরবরাহ পরিস্থিতির সার্বিক বিষয়ে রাজধানীতে বিদ্যুত্ ভবনে এক বৈঠকে বসে বিদ্যুত্ বিভাগ। ওই বৈঠক চলাকালেই এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, পরিস্থিতি সামলাতে কর্ণফুলি সার কারখানা এবং সিলেট শাহজালাল সার কারখানায় গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়েছে। আর দেড় হাজার থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার যেসব বিদ্যুেকন্দ্র মেরামত অবস্থায় আছে পহেলা রমজানের মধ্যে সেগুলো উত্পাদনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিদ্যুত্ সরবরাহের চলমান সংকটকে লোডশেডিং না বলে লোডশেয়ারিং মন্তব্য করে তিনি বলেন, রমজানে সিএনজি স্টেশন বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বন্ধ রেখে এবং সার কারখানার গ্যাস বিদ্যুতে দিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এখন আট হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে। ১০ হাজার মেগাওয়াট উত্পাদন হলেই সমস্যার সমাধান হবে। শনিবার পর্যন্ত ধৈর্য ধরুন। রমজানে বাণিজ্যিক বিভিন্ন কারখানা বন্ধ রাখা হবে। সেখান থেকে গ্যাস পাওয়া যাবে। রাতে বিপণি বিতানগুলোতে আলো কম জ্বালানো হবে। সেখানে সাশ্রয় হবে। সঙ্গে উত্পাদনও বাড়বে। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে প্রয়োজনে ১০ থেকে সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যাবে।

বিদ্যুত্ বিভাগের বৈঠকে বলা হয়, কোন এলাকায় লোডশেডিং করতে হলে তা গ্রাহককে আগে থেকেই জানাতে হবে। এ ছাড়া  ইফতার, তারাবির নামাজ ও সেহরির সময় লোডশেডিং না করা, রাত আটটায় বিপণি বিতান ও দোকান বন্ধ করতে হবে, সর্বোচ্চ বিদ্যুত্ চাহিদার সময় অর্থাত্ সন্ধ্যায় রি-রোলিং মিল, ওয়েল্ডিং মেশিন, লন্ড্রীসহ বেশি বিদ্যুত্ ব্যবহারকারী সরঞ্জাম ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে, সুপার মার্কেট, পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাতি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, ইফতার ও তারাবির সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের সাশ্রয়ী ব্যবহার করতে হবে, বিদ্যুতের অপচয় রোধ করতে সিএফএল বাল্বের পরিবর্তে এলইডি ব্যবহারে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক এক দিন এক এক এলাকার বিপণি বিতান বন্ধ রাখার নিয়ম (হলিডে স্ট্যাগারিং) কার্যক্রম জোরদার করা হবে, প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে এবং অবৈধ বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button