মুক্তমত

সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে

ঢাকা, ০৯ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

আজিমপুর কলোনিতে আমাদের বাসার কাছেই ছিল একটি এতিমখানা। নাম ছিল `সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা` ছোট বেলা থেকেই এতিমখানাটি দেখেছি। রোজায়, শবে বরাতে বিশেষ বিশেষ দিনে, কেউ অসুস্থ হলে সদগা দিতে , বাচ্চার আকিকায়, এতিম বাচ্চা গুলোকে কেউ কেউ খাওয়া দিত। আজও হয়ত দেয়। দেশ ছেড়েছি অনেক দিন। জানি না এখন পরিস্থিতি অনেক ভিন্ন কিনা। তবে তখন এতিমখানায় খাওয়া দেওয়া মানে যেটা ছিল সেটা হলো ওদের জন্য কিছু টাকা পয়সা খরচ করা যেটা দিয়ে ওদের তত্ত্বাবধায়করা ওদের জন্য খাওয়া কিনে বা রান্না করিয়ে দেবে। হয়তো ওদেরকে নতুন জামা কাপড় কিনে দেবে।

এতিমখানা ছাড়া অন্য কোন ধরনের আশ্রম বা সেবালয় দেশে ছিল বলে মনে পড়ে না। দুঃস্থ মহিলাদের পুনর্বাসনের জন্য আশ্রম বা বৃদ্ধাশ্রম বা স্মৃতিহীন মানুষ বা শয্যাশায়ী মানুষদের জন্য কোন সেবালয় বা অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য কোন স্কুল এরকম কিছু দেখেছি বলে মনে পড়ে না। `দাতব্য চিকিৎসালয়` শব্দটা দেখেছি মনে পড়ে, কিন্তু সেটা কতোখানি `দাতব্য` ছিল সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। রেডক্রস থেকে মাঝে মাঝে দুঃস্থদের কিছু সাময়িক সাহায্য করা হত মনে আছে।

এতিম খানার এতিম, বা রাস্তার ভিখিরি, এমনকি আমাদের বাড়ির দুয়ারে যেসব ভিখিরি আসতো তাদের সবাইকে একমাত্র করুণা, দয়া করা ছাড়া আর কিছু আমরা করতাম না আর সেই করুণার সাথেও মিশে থাকতো একধরনের অহংকার বা পরকাল গুছানোর আশা। সত্যিকার ভালোবাসা থেকে, মানবিকতা থেকে যদি তাদের জন্য আমরা কিছু করতাম, তাহলে শুধু তত্ত্বাবধায়কের হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে সরে যেতাম না। আমরা এতিমখানা গুলোয় যেয়ে ওদের সাথে কিছুটা সময় কাটাতাম, ওদের সুখ দুঃখের খোঁজ নিতাম, সামনে বসে ওদের তৃপ্তি করে খাওয়া দেখতাম। এই অনাথ, দুঃস্থ মানুষগুলোর জীবনে একটু স্নেহ, মমতার বড়ই অভাব। একটু খানি প্রকৃত স্নেহ পেলে এরা যে কী পরিমাণ খুশি হয়, কৃতজ্ঞ হয় সেটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

সত্যি কথা বলতে আমাদের দেশের সামাজিক অবকাঠামোতে আমরা যেভাবে বেড়ে উঠি, সেখানে আমাদেরকে অনেকটা স্বার্থপর হতে শেখায়। নিজের পড়ালেখা, চাকরি, ভবিষ্যৎ, নিজের পরিবার বড়জোর বাবা, মা, ভাই, বোন, দাদা, দাদি, নানা, নানী, চাচা, খালা এর বাইরে আর কেউকে ভালবাসতে, কাছে টেনে নিতে আমরা শিখি না। বিদেশে এসে আমার প্রথম দেখার সুযোগ হয়েছে যে অচেনা, অজানা মানুষের জন্যও মানুষ ভালোবেসে কত কিছু করতে পারে আর অনুভব করতে পেরেছি যে সেভাবে ভালবাসতে পারলে নিজের মনের ভেতরেও কত খানি শান্তি লাগে।

এখানে খুব ছোটবেলা থেকে স্কুল, কলেজগুলোতে পড়ালেখার পাশাপাশি বাচ্চাদেরকে শেখানো হয় সমাজের অন্য সব মানুষের প্রতি তোমার অনেক দায়িত্ব আছে। তোমার বেশি আছে, অন্যের কম, তার মানেই তার সাথে নিজের সুখ ভাগ করে নাও, তাতে আনন্দ বেড়ে যাবে বহুগুণ। স্কুল থেকে, পরিবার থেকে শিশুদেরকে নিয়মিত ভলান্টিয়ার করতে বিভিন্ন ধরনের জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। তারা হয়তো সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য খাবার যোগাড় করে, খাবার প্যাকেট করে, তাদেরকে নিজ হাতে চিঠি লেখে। বছরের বিশেষ আনন্দের সময়, বিশেষ করে ক্রিসমাসে এটা এদের উৎসব পালনের একটা অংশ। দল বেঁধে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা বা অফিসের কর্মচারীরা অনাথাশ্রমে যেয়ে দুঃস্থ শিশু বা মহিলা বা বৃদ্ধদের সাথে, হাসপাতালে অসুস্থদের সাথে যেয়ে সময় কাটায়।

এধরনের কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে বেশ কয়েকবার। একবার অফিস থেকে গিয়েছিলাম এক জায়গায়, যেসব বাচ্চাদের বাবা, মা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন ঝামেলা করেছে, বাচ্চাগুলোর যাওয়ার আর জায়গা নেই কোথাও তাদেরকে পালক দেওয়ার জন্য ওখানে এনে রাখা হয়। আমরা একটা দুপুর ছিলাম ওদের সাথে। ওরা যে কী খুশি। ওদের সাথে গল্প করেছি, খেয়েছি, খেলেছি। নিজেরও অনেক ভালো লেগেছে আর ওদেরও। বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে দেখেছি তাদের কাছে নিয়মিত অনেকেই যায়, তাদের সাথে কথা বলে, বই পড়ে শোনায়, হয়তো হাঁটতে নিয়ে যায় বাগানে। নিজের সন্তানরা নিয়মিত না আসলেও এই পর নিঃস্বার্থ মানুষগুলো তাদের আপন হয়ে যায়। তাদের নিজেদেরও সময় কাটে ভালো।

আমাদের অফিস থেকে দুঃস্থ মহিলাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় নিয়মিত তাদেরকে কম্পিউটারের টুকটাক কাজ শেখানো হয় যেন তারা নিজেরা কিছু করে খেতে পারে। স্কুলের বাচ্চারা বিদেশ থেকে আসা বাচ্চাদেরকে নতুন ভাষা, পরিবেশ, পড়ালেখা এগুলো নিয়ে সাহায্য করে, যারা একা থাকে, বৃদ্ধ, অসুস্থ, এমনকি দরিদ্র তাদের ঘর বাড়ি তৈরিতেও সাহায্য করে।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার এই সাহায্য, ভালোবাসার যে হাত বাড়িয়ে দেওয়া, সেই হাত একেবারে নিঃস্বার্থ। কোন উদ্দেশ্য নেই এতে, লোক দেখানো, নাম ফুটানো, আখেরাত গুছানো, ভোট পাওয়া কিছুই না। এর মাঝে কোন করুণা মিশে থাকে না, কোন অহংকার, লোভ কিছুই মিশে থাকে না। মিশে থাকে বিশুদ্ধ আবেগ, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ। এর মূল মন্ত্র হল `সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।`

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button