সাক্ষাৎকার

ট্রানসন হোল্ডিং ৫০টি দেশে থাকলেও বাংলাদেশে এককভাবে এসেছে: রেজওয়ানুল হক

ঢাকা, ০৯ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

বাংলাদেশে সিমেন্স মোবাইল ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার পর স্থানীয় একটি মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্র্যান্ড দাঁড় করানোর স্বপ্ন দেখেন রেজওয়ানুল হক। চলতি বছরের শুরুর দিকে উদীয়মান প্রতিষ্ঠান ট্রানসন হোল্ডিং লিমিটেড নামের চীনের শীর্ষস্থানীয় একটি কোম্পানির সঙ্গে জয়েনভেঞ্চারে কাজ শুরু করেছেন তিনি। চীনা এই কোম্পানিটি বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশে ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা কর থাকলেও বাংলাদেশে তারা এককভাবে ব্যবসা করতে এসেছে। বাংলাদেশের বাজারে তাদের ব্যবসার সম্ভাবনা ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন ট্রানসন হোল্ডিং লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) নেতা রেজওয়ানুল হক।

বাংলাদেশে একটি বড় হ্যান্ডসেট কোম্পানি আপনার হাতে বড় হয়েছে। আপনার নতুন হ্যান্ডসেট কোম্পানির পেছনের গল্প কী?  

রেজওয়ানুল হক: বিশ্বজুড়ে ট্রানসন হোল্ডিং হচ্ছে একটি উদীয়মান প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর ৫০টির বেশি দেশে তারা অপারেট করছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি আফ্রিকাতে প্রায় এক নম্বর অবস্থানে চলে গেছে। এরা এশিয়াতে ফোকাস করেছে বেশ কিছুদিন ধরে। ভারতে ইতোমধ্যে তারা দ্বিতীয় অবস্থানে চলে গেছে। এ জন্য সময় লেগেছে মাত্র এক বছর। সব দিক বিবেচনা করে দেখলাম এই প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। এ ছাড়া তারা উদীয়মান দেশগুলোতে খুব ভালো পজিশন নিচ্ছে। বাংলাদেশে শুরু করার আগেই ভালো অবস্থানে চলে গেছে, কারণ হচ্ছে আমাদের প্রোডাক্টের কোয়ালিটি সম্পর্কে ক্রেতা এবং বিক্রেতারা জেনে গেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোবাইল ফোনের ফিচার, কোয়ালিটি এবং প্রাইজ গ্রাহকদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

আপনার প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন কবে হচ্ছে? 

রেজওয়ানুল হক: খুব শিগগিরই চালু হচ্ছে। ট্রানসন হোল্ডিং মূলত মাল্টি ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করে। আমাদের তিনটি ব্র্যান্ড রয়েছে। আইটেল, টেকনো এবং ইনফিনিক্স। সেখানে স্বল্পমূল্যে বেশি ফিচারের ফোন, টেকনো হচ্ছে মধ্যম দামের ফোন এবং ইনফিনিক্স হচ্ছে বেশি দামের ফোন; তবে এটা অনলাইন ব্র্যান্ড। সব কিছু বিবেচনা করলে দেখতে পাবেন ট্রানসন বাংলাদেশের সব স্তরের মানুষের সাথে কানেক্ট করতে চায়। এর মধ্যে আইটেল এবং ইনফিনিক্স ইতোমধ্যে চালু হয়েছে এবং টেকনো জুন মাসেই বাংলাদেশে চালু হবে।

আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর আগেই আপনারা মার্কেটে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। এই ভালো করার রহস্য কী? 

রেজওয়ানুল হক: ক্রেতা এবং বিক্রেতা একটি প্রোডাক্ট বিক্রি করার পর দুই পক্ষই চান যে প্রোডাক্টটি ভালো হোক এবং প্রোডাক্ট খারাপ হওয়ার যে ঝামেলা সেখান থেকে মুক্ত থাকুক। আমরা খুব বড় করে বলতে চাই না আমাদের ৪৫টি বা ১০০টি সার্ভিস সেন্টার রয়েছে। আসলে সার্ভিস সেন্টারের চেয়ে মূলমন্ত্র হচ্ছে সার্ভিস সেন্টারে না আসা। আমাদের সার্ভিস সেন্টার রয়েছে; তবে আমরা চাই একজন গ্রাহক ফোন ক্রয়ের পর যেন সার্ভিস নিতে আসার প্রয়োজন না হয়। সেখানেই আমরা ফোকাস করছি। আমাদের কোনো প্রোডাক্ট ক্রয় করার ১০০ দিনের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে প্রোডাক্টটি রিপ্লেসমেন্ট দিচ্ছি। এর মাধ্যমে গ্রাহকদের বড় একটি অংশের আত্মতৃপ্তির একটি ব্যাপার এসেছে।

এখন পর্যন্ত কতগুলো জেলায় আপনাদের ব্যবসা প্রসার করতে পেরেছেন? 

রেজওয়ানুল হক: আমরা প্রথম দিকে রাজশাহী এবং খুলনাতে শুরু করেছি। তবে জুনের শুরু থেকে সারা বাংলাদেশেই আমাদের প্রোডাক্ট পাওয়া যাবে।

ডিলারদের বাকি দেওয়া বা কমদামে হ্যান্ডসেট দেওয়া নিয়ে মালিক পক্ষের দ্বন্দ্বের ঘটনা অনেক পুরাতন। এ সব বিষয় হ্যান্ডেল করছেন কীভাবে? 

রেজওয়ানুল হক: বাজারে একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। হ্যান্ডসেট বিক্রি করার জন্য বিভিন্ন লোভনীয় প্যাকেজ, বিদেশ ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, নানান অফার দিতে দেখা যায়। আপনি খেয়াল করে দেখবেন, যে প্রোডাক্ট বিক্রি হচ্ছে না, সেটা বিক্রি করার জন্যই এ ধরনের প্যাকেজ বেশি আসে। আপনার প্রোডাক্ট যদি খুব বেশি বিক্রি হয় এবং বাজারে চাহিদা থাকে তাহলে কিন্তু এ ধরনের প্রোমোশন করার দরকার হয় না। মূলত অবিক্রিত মাল বিক্রি করার জন্যই প্রোমোশন চালানো হয়। আমরা সুস্থ প্রতিযোগিতা করতে চাই। আমরা কোনো প্রোডাক্ট বিক্রি করে লাভ করলে আমার রিটেইলারও বিক্রি করে লাভ করবে। আমরা লোভনীয় কোনো অফার না দিয়ে লাভবান করার চেষ্টা করছি।

আফটার সেল সার্ভিস নিয়ে আপনারা কী কী করছেন? 

রেজওয়ানুল হক: আমরা সাধারণ আফটার সেল সার্ভিস নিয়েই কাজ করছি। সারা বাংলাদেশে যেখানে আমাদের প্রোডাক্ট বিক্রি হবে সেখানেই সার্ভিস সেন্টার করার ইচ্ছা রয়েছে। এটা একদিনের কাজ নয়। সময় নিয়ে আমরা এসব সার্ভিস সেন্টার করতে চাই। তবে আপাতত ১০০ দিনের মধ্যে হ্যান্ডসেটের কোনো সমস্যা হলে সেটা রিপ্লেসমেন্ট করে দেওয়া এবং ১২ মাসের ওয়ারেন্টি তো রয়েছেই।

আপনাদের কোন হ্যান্ডসেট মার্কেটে সবচেয়ে বেশি চলছে এবং কেন?

রেজওয়ানুল হক: আমাদের সব ধরনের ফোন এখনও মার্কেটে দেওয়া হয়নি। আমরা মাত্র শুরু করেছি। আমাদের খুব ভালো চলছে ফিচার ফোন। বিশেষ করে ৫২৩১ বাজারে খুব ভালো চলছে। যদি বলেন, বাজারে ফিচার ফোনের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সেট কোনটি তাহলে আমাদের এই সেটের নাম প্রথমদিকেই আসবে। এ ছাড়া বাংলালিংকের সাথে সম্প্রতি স্মার্টফোন নিয়ে একটি ক্যাম্পেইন শুরু করেছি। সেটারও বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে।

ফিচার ফোন নাকি স্মার্টফোনে আপনারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন? 

রেজওয়ানুল হক: আমি যেটা আগেই বলেছি, ট্রানসন হোল্ডিং হচ্ছে মাল্টি ব্র্যান্ডিং স্ট্যাটিজি পলিসি। আমরা শুধুমাত্র ফিচার ফোন বা স্মার্টফোন না; আমরা গ্রাহকদের প্রতিটি প্রত্যাশার সাথে সম্পৃক্ত হতে চাই। এখানে যেমন স্মার্টফোনে আমাদের ফোকাস রয়েছে ঠিক একইভাবে ফিচার ফোনেও ফোকাস রয়েছে।

এখন আপনাদের মার্কেট শেয়ার কত এবং আগামী এক বছরে কতদূর যেতে চান? 

রেজওয়ানুল হক: আমরা কতটুকু ভালো করতে পারব, তার ওপর এটা নির্ভর করছে। সবারই স্বপ্ন থাকে বড় হওয়ার। আমাদেরও ইচ্ছা আছে কোনো একদিন আমরা শীর্ষ স্থানে পৌঁছে যাব। তবে শীর্ষে যাওয়ার আগে আমাদের গ্রাহক এবং চ্যানেল পার্টনারদের সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কাজ করতে চাই। তাদের ভুলে শীর্ষে যেতে চাই না।

বিদেশি হ্যান্ডসেট কোম্পানির প্রভাবে স্থানীয় হ্যান্ডসেট কোম্পানির ব্যবসা খারাপ হচ্ছে। এটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? 

রেজওয়ানুল হক: এখন আমাদের মার্কেটে যে প্রতিযোগিতা চলছে এটা স্থানীয় বনাম আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। আমরাও কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। আমরা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হলেও স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের একটি কাস্টমাইজেশন করছি। ট্রানসন হোল্ডিং পৃথিবীর ৫০টি দেশে থাকলেও বাংলাদেশে সরাসরি এবং এককভাবে এসেছে। আমাদের পরবর্তী যে হ্যান্ডসেট বাংলাদেশের জন্য তৈরি করা হবে, সেটা মূলত স্থানীয় বাজারের চাহিদা এবং আরএনডির ওপর ভিত্তি করে করা হবে।

দেশে অনেকেই নতুন মোবাইল কোম্পানি করার পর বন্ধ করে দিচ্ছেন। এর কারণ কি বলে আপনি মনে করেন? 

রেজওয়ানুল হক: বাংলাদেশের মোবাইল হ্যান্ডসেটের মার্কেট প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার। এই মার্কেটে প্রবেশ করার জন্য যেকোনো ব্যবসায়ীর জন্য একটি আকর্ষণীয় ক্ষেত্র। এই ব্যবসায় প্রবেশ করা খুব সহজ। এই ব্যবসায় সবচেয়ে বড় ঝামেলা হচ্ছে টিকে থাকা। এই ব্যবসায় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এবং আরএনডি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এখানে কোনো কোম্পানি দুর্বল হলে সে এই মার্কেটে কোনোভাবেই টিকে থাকতে পারবে না। যেমন কোয়ালিটি প্রোডাক্ট না দিলে আপনি শর্ট টাইমে ব্যবসা করতে পারবেন কিন্তু লং টাইমে টিকতে পারবেন না। আপনার যদি স্ট্রং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এবং আরএনডির সাপোর্ট না থাকে সে ক্ষেত্রে কিছুদিন পরেই দেখবেন আপনি প্রোডাক্ট পাচ্ছেন না বা প্রোডাক্টের চাহিদা মেটাতে পারছেন না। এ জায়গায় বেশিরভাগ মানুষ ব্যর্থ হচ্ছে বলে কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

নতুন যারা মোবাইল ফোন ব্যবসায় আসতে চান তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী? 

রেজওয়ানুল হক: মোবাইল ফোন একটি টেকনোলজিক্যাল বিজনেস। এখানে নতুন ব্যবসায়ীদের নলেজের ওপর ফোকাস করা উচিত। একটি প্রোডাক্ট নিয়ে এসে আমি কীভাবে বিক্রি করব, কীভাবে মার্কেটিং করব, সেটা জানা জরুরি। আবার তার চেয়েও বেশি জরুরি, আমরা প্রোডাক্টিতে আরএনডি কী করছি, প্রোডাক্টের মধ্যে কী উপাদান দিচ্ছি এবং প্রোডাক্টির মধ্যে কী দিলে আমাদের গ্রাহকরা পছন্দ করবে, সেই জায়গাগুলোতে স্টাডি করা।

আগামীদিনে আপনাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই। 

রেজওয়ানুল হক: আমরা আসলে বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হতে চাই। গ্রাহক যেন একবাক্যে বলে আমাদের প্রোডাক্টটি খুব ভালো। এ ছাড়া আমাদের সাথে যারা ব্যবসা করছেন, তারা সবাই যেন আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করে সন্তুষ্ট হতে পারেন, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button