জেলার সংবাদ

বন্দরনগরীর প্রাণকেন্দ্রে গম্বুজওয়ালা ‘রহস্যময়’ ঘর

ঢাকা, ১০ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

নগরীর ব্যস্ততম প্রাণকেন্দ্র কে সি দে রোড। অদূরেই এখনো চালু প্রেক্ষাগৃহ সিনেমা প্যালেস। রাইফেল ক্লাব থেকে পূর্ব দিকে যেতে ডান পাশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, আর  বাম পাশে মুসলিম ইনস্টিটিউট হল, গণপাঠাগার ফেলে একটি সামনে যেতেই তার লাগোয়া সবুজ সুন্দর নার্সারি বেস্টিত দেয়ালঘেরা ছোট্ট এই গম্বুজওয়ালা ঘরটি সবারই নজর কাড়ে। এখানেই পাঁচটি রাস্তা এসে ‘মোহনার’ সৃষ্টি করেছে। যারা এটিকে চেনে না, জানে না, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মানুষেরা প্রবীণদের প্রশ্ন করে, ‘খঁইত ফারিবে না, ইবা কি (বলতে পারো এটা কি)’? অনেকেই ভাবে এটি হয়তো কোনো ধর্মশালা, কিংবা পানিতোলার প্রাচীন পাম্প হাউজ, কিংবা উপাসনালয়।
অথচ এই ছোট ঘরটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই নগরীর শিক্ষা-সংস্কৃতি, সংগীত, গ্রন্থপাঠসহ একটি অনন্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিগত পঁচাত্তর বছরের ইতিহাস। ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ সব আমলের আমলা-প্রশাসক, তত্কালীন শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, সাহিত্যিক, স্পিকার, মন্ত্রী—হেন কোনো বিশিষ্টজন নেই যে তাদের পদচারণা এখানে ঘটেনি। বিগত কয়েক দশক ধরে এই ঘরটির প্রাণচাঞ্চল্য যেন ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে আসছে। এই ঘরটি আশেপাশের আকাশচুম্বী অট্টালিকার আড়ালে অনেকটা প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ধারণা করা হয় এই ঘরটি নির্মিত হয়েছিল একশ বছর আগে। এর ভেতর কি হয়, কিংবা কি হতো এই প্রশ্ন কৌতূহলী মানুষের মনে।
চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন সংগঠন ‘দি সোসাইটি অব আর্টস লিটারেচার এন্ড ওয়েলফেয়ার’ -এর কার্যালয় এই গম্বুজওয়ালা ঘরটি। সম্প্রতি সরেজমিনে এই সংস্কৃতিকেন্দ্রটি পরিদর্শন করতে গেলে সেখানে স্থাপিত নগরীর একটি ব্যস্ততম নার্সারির দেখা মিলে। নার্সারির ভেতর যিনি ছিলেন তিনি জানান, সংগঠনটি এখনো সক্রিয়। সপ্তাহে চার দিন এখানে গান শেখানো হয়। তবে মূল্যবান গ্রন্থসমৃদ্ধ পাঠাগারটি আর আগের অবস্থায় নেই। তিনি একটি বুকলেট দিলেন, ঠিকানা দিলেন সংগঠনটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস মিয়ান-এর।
আলাপ হলো তার সঙ্গে। তার কাছ থেকে জানা গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এই সংগঠনটি ১৯৪২ সালে চট্টগ্রামের কয়েকজন সমাজসেবী যুবক নজরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন খান, আবদুল মাবুদ খান, মোহাম্মদ ইলিয়াস, নজরুল হক প্রমুখের ঐকান্তিক আগ্রহে সংস্কৃতিচর্চা ও সমাজ সেবার লক্ষ্যে সংগঠনটি গঠিত হয়। ১৮৪৮ সালে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আহমদ ছগির চৌধুরীর একান্ত সহযোগিতায় এবং তত্কালীন ব্রিটিশ বিভাগীয় কমিশনার ডি. কে পাওয়ার এবং ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট টি. ব্যারেট-এর বদান্যতায় সংগঠনটি এই ঘরটিতে সংগঠনের কার্যালয় ও কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমোদন পায়। এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬০ সালে তত্কালীন সময়ের জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে রেজিস্ট্রীভুক্ত হয়। ১৯৬২ সালে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন লাভ করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকেও এটি স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৫৮ সালে তত্কালীন চট্টগ্রাম পৌরসভা সোসাইটির এই জায়গা ও ঘরকে হোল্ডিং নাম্বার প্রদান করে। সরবরাহ করা হয় পানি ও বিদ্যুত্। সম্পাদন করা হয় যথাযথ ভূমি জরিপ। এই সংগঠনটি গোড়া থেকেই যেসব কাজ করে আসছে, তার মধ্যে রয়েছে, শিশুসাহিত্যের বিকাশ, ঘূর্ণিঝড় বন্যায় ত্রাণ-কর্মসূচি পরিচালনা, সংগীত শিক্ষা, সেলাই শিক্ষা, নার্সারির মাধ্যমে আয়বর্ধক প্রকল্প। এক সময় এখানে টাইপ এন্ড শর্টহ্যান্ড প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে। বর্তমানে এর চাহিদা কমে যাওয়ায় এখানে কম্পিউটার ও ডিজিটাল আইটি শিক্ষা চালু করার কথা ভাবা হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির জন্য আবারো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সহযোগিতা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রাপ্ত তথ্যে এই সোসাইটির সঙ্গে নানাভাবে সম্পর্কিত চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের বাইরের বিশিষ্ট জনেরা হলেন- ব্রিটিশ কমিশনার ও. আর মার্টিন, নূর আহমেদ চেয়ারম্যান, সি.এস.পি এফ. এ করিম, সাহিত্যিক আবুল ফজল (সোসাইটির সাবেক সভাপতি), সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম চৌধুরী, কবি আবদুল কাদির, কবি আবদুস সালাম, পাকিস্তান সরকারের তত্কালীন মন্ত্রী আই.আই চন্দ্রীগড়, তত্কালীন বিভাগীয় কমিশনার টি. বি জেসমিন, এম.এ বারি, তত্কালীন পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী এ. কে. খান, তত্কালীন পাকিস্তানের স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী, আজিজুর রহমান এমপি, সংগীত শিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী, সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সাবেক মেয়র মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন প্রমুখ।
Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button