জেলার সংবাদ

তানোরে স্কুল শিক্ষকের বাড়িতে ‘জঙ্গি আস্তানা’

ঢাকা, ১২ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

রাজশাহীর তানোরে এবার জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

রোববার রাতে ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে স্কুলশিক্ষক রমজান আলীর বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ।

এসময় জঙ্গি সন্দেহে তার দুই ছেলে ও মেয়ের জামাইকে গ্রেফতার করা হয়। পরে পুলিশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওই পরিবারের নারী ও শিশুসহ আরও নয়জন আত্মসমর্পণ করেন।

পুলিশের দাবি, বাড়িটিতে সুইসাইডাল ভেস্টসহ বোমা রাখা আছে। তবে থেকে ঢাকা বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্য এসে পৌঁছলে সেগুলো ধ্বংস করা হবে।

পুলিশ জানায়, তানোরের গৌরাঙ্গপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রমজান আলীর বাড়িটি এখন নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে জঙ্গিরা -এমন তথ্য পায় বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। রোববার রাত ১২টার দিকে তারা তানোর থানা পুলিশকে নিয়ে ওই বাড়িটি ঘিরে ফেলেন।

এসময় রমজান আলীর দুই ছেলে ইব্রাহিম, ইসরাফিল ও মেয়ের জামাই রবিউলকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে পিস্তলসহ পাঁচ রাউন্ড গুলি পায় পুলিশ। পরে তাদের দেয়া তথ্যে পুলিশ জানতে পারে, ওই বাড়িতেই বোমাসহ সুইসাইডাল ভেস্ট মজুদ আছে।

দ্বিতীয় দফায় অভিযান পরিচালনার আগে বাড়ির অন্য সদস্যদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায় পুলিশ। এরপরই  সোমবার ভোর ৬টার দিকে রমজান আলী, তার স্ত্রী আয়েশা, মেয়ে হাওয়া বিবি, দুই ছেলের বউ ও চার শিশুসন্তানসহ মোট নয়জন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। পরে তাদেরকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়।

এসময় আশেপাশে লোকজন চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করে পুলিশ। এমনকি প্রতিবেশীদেরও বাড়ি থেকে বের হতেও দেয়া হয়নি।

তবে পুলিশের দাবি, নিরাপত্তার স্বার্থে ওই এলাকায় মানুষ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

অভিযান সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আটকের ব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, জঙ্গি সন্দেহে রমজান মাস্টারের বড় ছেলে ইব্রাহিম (৩৪), ছোট ছেলে ইসরাফিল আলম (২৬), মেয়ের জামাই রবিউল ইসলামকে (৩৫) আটক  করা হয়েছে।

রবিউলের বাড়ি উপজেলার বনকেশর গ্রামে। সে কাঠমিস্ত্রি। এদের মধ্যে ইসরাফিল হোমিও চিকিৎসক। মুণ্ডুমালা কামিল মাদ্রাসা থেকে তিনি ফাজিল পাস করেছেন। ইব্রাহিম সার ব্যবসায়ী। আটক তিনজনই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। আটকের পর তাদের তানোর থানায় নেয়া হয়।

এদিকে, সোমবার সকালে আত্মসমর্পণকারী তিন নারী ও চার শিশুসহ নয়জনকে তানোর থানা হেফাজতে নেয়া হয়।

তারা হলেন- জঙ্গি সন্দেহে ইব্রাহিম ও ইসরাফিলের বাবা রমজান মাস্টার, মা আয়েশা বেগম, মেয়ে হাওয়া খাতুন, ইব্রাহিমের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন, ইসরাফিলের স্ত্রী হারেছা খাতুন।

আর শিশুদের মধ্যে হাওয়া খাতুনের এক মেয়ে ও মর্জিনা খাতুনের তিন মেয়ে রয়েছে। যাদের বয়স এক মাস থেকে আট বছর পর্যন্ত।

এদিকে রোববার রাত থেকে অভিযান শুরু হলেও সোমবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাড়িটি ঘিরে রাখে পুলিশ। সকালে ওই বাড়ির সকল সদস্যই পুলিশের হাতে ধরা দেয়ার পর অভিযান কার্যক্রম শিথিল হয়ে পড়ে।

রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) সুমিত চৌধুরী জানান, ওই বাড়িতে সুইসাইডাল ভেস্ট ও বেশ কিছু শক্তিশালী বিস্ফোরক দ্রব্য মজুদ আছে। এ কারণে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা বিশেষজ্ঞ দলকে খবর দেয়া হয়েছে। তারা এসে পৌঁছলে বিস্ফোরকগুলো ধ্বংস করা হবে।

তবে অভিযানের খবর জানতে বার বার রাজশাহীর পুলিশ সুপার মেয়াজ্জেম হোসেন ভূঁঞার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তাকে এসএএস পাঠিয়েও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার বেলা ১১টার দিকেই এসপি মোয়াজ্জেম ঘটনা ত্যাগ করে তার কার্যালয়ে চলে যান।

পাঁচন্দর ইউপি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মুঞ্জুরুল ইসলাম মুঞ্জু বলেন, প্রায় ১০-১২ বছর ধরে রমজান আলীর পরিবারের সদস্যরা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদের নামাজ পড়তো। চলতি রমজান মাসেও তারা সৌদি আবরের সঙ্গে মিল রেখে একদিন আগে থেকে রোজা রাখা শুরু করে। গত বছর ইব্রাহিম ও ইসরাফিলের বাবা রমজান আলী এবং তাদের মা আয়শা বেগম হজ্ব করেছেন।

তিনি বলেন, ইব্রাহিম ও ইসরাফিল মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে। বর্তমানে ইব্রাহিমের বাড়ির পাশে সার ও কীটনাশকের দোকান আছে। সেই সঙ্গে তিনি ব্যাটারি চালিত অটোগাড়ি চালান।

মুঞ্জুরুল ইসলাম মুঞ্জু বলেন, ইসরাফিল বাড়ির পাশে হোমিও দোকান দিয়ে ব্যবসা করেন। তাদের ভগ্নিপতি রবিউলের বাড়ি একই ইউনিয়নের বনকেশর চকপাড়া গ্রামে। রবিউল কাঠ মিস্ত্রির কাজ করে। স্ত্রীর সন্তান হওয়ার পর থেকে রবিউল শ্বশুর বাড়িতে ছিল।

ইসরাফিলের প্রতিবেশী জামিলুর রহমান জানান, বিগত ৫-৭ বছর ধরে ইসরাফিলের চলাফেরা আলাদা হয়ে গেছে। ওই পরিবারের লোকজন প্রয়োজন ছাড়া কারো সঙ্গে মিশতো না। মৌলবাদী ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী তারা।

একই গ্রামের আজিজুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন জানান, তারা সৌদির সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ পালন করে। বাইর থেকে ২০-২৫ জন লোক এনে প্রতি বছরে ঈদের নামাজ পড়েন তারা।

ইসরাফিলের চাচাতো ভাই আবদুল জলিল জানান, ইসরাফিলের চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ভাইরা ভাইয়ের জঙ্গি কানেকশন আছে। এ সুবাদে ইসরাফিলও জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে।

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শওকাত আলী জানান, বর্তমানে ওই বাড়ির এক কিলোমিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button