জাতীয়

দেশের জঙ্গিরা অ্যাকটিভ টেলিগ্রামে, মনিটরিংয়ে নেই সমন্বয়

ঢাকা, ১৪ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

২০১৬ সালের ১ জুলাই। রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোঁরায় অবস্থান নেয় পাঁচ জঙ্গি। রাতে হলি আর্টিজান ঘিরে ফেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু রাতের মধ্যেই ওই রেস্তোঁরাটিতে হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয় আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস।

এ সময় তারা মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে বিবৃতিতে এসব তথ্য জানায়। টেলিগ্রামে তারা প্রথমে জানায়, ‘আইএস কমান্ডোরা’ বিদেশি নাগরিকরা অবস্থান করছে এমন একটি রেস্তোঁরায় হামলা চালিয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর সেখানে আরও একটি আপডেট দেওয়া হয়। যেখানে বলা হয় এ হামলার ঘটনায় ২০ জন নিহত হয়েছেন। পরবর্তী একটি আপডেটে বলা হয় এ হামলার ঘটনায় নিহত বেড়ে ২৪ জনে পৌঁছেছে। এ সময় সেখানে হামলায় নিহতদের ছবিও প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু সেই সময়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বের করতে পারেননি কাদেরকে বা কীসের মাধ্যমে এইসব ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে।

এ ঘটনার পাঁচদিন পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, হলি আর্টিজানে থাকা জঙ্গিরা জিম্মিদের নৃশংসভাবে হত্যা করার পর ‘থ্রিমা’ নামে একটি অ্যাপ ব্যবহার করে সেই ছবি আপলোড করেছিল।

তবে আর্টিজানে হামলার পর নড়েচড়ে বসে দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে জঙ্গি বিরোধী অভিযান। আর ওইসব অভিযানে প্রাণ হারান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য। ছয়মাসে নারীসহ নিহত হন ৩৫ জঙ্গি। এরপরেও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টায় জঙ্গিরা।

এদিকে বর্তমান সময়ে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে বেশি ঘটছে জঙ্গি হামলার ঘটনা। দেশগুলোর পুলিশের তদন্তে জানা যাচ্ছে হামলাকারীরা হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পাঠিয়ে দিচ্ছে বা অজ্ঞাত হাইকমান্ডের নির্দেশনা পালন করছে।

অর্থ্যাৎ জঙ্গি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রথমেই সামনে চলে আসছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। নিজেদের যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী উপায় হিসেবে তারা ইন্টারনেট নির্ভর এই মাধ্যমগুলোকেই সামনে রাখছে সবসময়।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ইন্টারনেটে গোপনে চলছে জঙ্গিদের দল ভারি করার কার্যক্রম। তারা বেছে নিচ্ছে নিত্যনতুন পন্থা। আর দেশের জঙ্গিরা নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে টেলিগ্রামকে। সেখানে তারা সবচেয়ে সক্রিয়।

জানা যায়, টেলিগ্রামে জঙ্গিদের রয়েছে একাধিক চ্যানেল। এর মধ্যে রয়েছে হুদহুদ, আবু তায়েব।

দেশের সাইবার নিরাপত্তা সহায়তাকারী সংগঠন ‘ক্রাইম রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ফাউন্ডেশন’ এর উপদেষ্টা তানভীর হাসান জোহা প্রিয়.কমকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আইএস’র যে টিমটি কাজ করছে তারা টেলিগ্রামে খুবই অ্যাকটিভ। তাদের চ্যানেলগুলোতে তারা খুবই সক্রিয়। সহজেই কেউ ওই চ্যানেলগুলোর সদস্য হতে পারবে না। সেখানে তারা তাদের পরবর্তী কার্যপরিকল্পনা করে থাকে। এসবের মধ্যে হামলার বিষয়গুলোও থাকে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনিটরের মাধ্যমে জঙ্গি বৃদ্ধির বিষয়টি কিছুটা হলেও প্রতিকার করা সম্ভব বলে মনে করেন সাইবার এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল নেটওয়ার্ক মনিটর করার জন্য আমাদের কিছু প্রোডাক্ট রয়েছে। বিদেশে এসব দিয়ে ডিজিটাল টেররিস্টদের মোকাবেলা করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে ওইসব ডিভাইস কিনলে আমরা ওইসব ট্যাররিস্টদের মনিটর করতে পারবো।’

এতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষা পাবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘প্রাইভেসির দোহাই দিয়ে জঙ্গি ধরতে পারব না, এইটা ঠিক না। আমাদের দেশে জঙ্গি বিষয়টি বেড়ে চলছে, এটি বেড়ে যাবে যদি ঠিকমতো মনিটর করা না হয়। যখন ঘটনা ঘটতে থাকবে তখন হাজার কিছু কেনাকাটা করেও কোনো লাভ হবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমরাতো সবাইকে টার্গেট করব না। এই কাজে যেসব মেশিন ব্যবহার করা হয় সেখানে নির্ধারিত কিছু কিওয়ার্ড বিশেষ করে জঙ্গিরা ব্যবহার করে থাকে সেইসব কথোপকথনগুলো ডিটেক্ট করা সম্ভব।’

প্রযুক্তি এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘কোনো লোক যখন জঙ্গি রিলেটেড কিওয়ার্ডগুলো ইন্টারনেটে সার্চ দেয় তখন তার নামে অটোমেটিক একটি আর্টিফেসিয়েল ইন্টিলিজেন্স প্রোফাইল তৈরি হয়। এটিকে এআইপি বলে। প্রোফাইল দেখে বোঝা সম্ভব কার কোন দিকে ইন্টারেস্ট। এইভাবে আমরা জঙ্গিদের পরিচয় বা কার্যকলাপ বের করতে পারব।’

দেশে সাইবার নিরাপত্তায় যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মনিটরিংয়ে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর সমন্বয় নেই বলে মন্তব্য করেন জোহা।

তিনি বলেন, ‘জঙ্গি বিষয়ে মনিটরিংয়ে আমাদের গ্রামাটিক্যাল মিসটেক রয়েছে। এখনো ডিজিটাল স্ট্রাকচারে এই স্ট্যাবলিশম্যান্টটি আমরা করাতে পারিনি। এছাড়া এ বিষয়ে প্র্যাকটিসের অভাব রয়েছে।’

‘আমাদের দেশে বিভিন্ন সংস্থারা ভিন্নভাবে বিষয়টিকে মনিটর করার চেষ্টা করছে। তবে আমাদের ব্যর্থতা এই যে এসব কাজে নিয়োজিত এজেন্সিগুলো নিজেদের প্রতিবেদনগুলো পারস্পারিক কাজে সহযোগিতা করে না। যার কারণে আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে জঙ্গি নিধনের জন্য, অনেক সংস্থা কাজ করছে। আমার কাছে মনে হয় তারা কাজ করছে নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন প্লাটফর্মে। তারা আক্ষরিক অর্থে একত্রিত হলেও বাস্তবিক অর্থে একত্রিত নয়।’, যোগ করেন তিনি।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button