জাতীয়

চাকার পিন না খুলেই বিমানের উড্ডয়ন

ঢাকা, ১৬ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

চাকার সেফটি পিন না খুলে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট বিপজ্জনকভাবে আকাশে উড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। এয়ারক্রাফটটি ফ্লাই করার পর পাইলট চাকাগুলো ভেতরে ঢুকাতে পারছিলেন না। ফলে বাধ্য হয়ে আকাশে তেল পুড়িয়ে ৫০ মিনিট পর ফের শাহজালাল (রা.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেন বিমানটি।

গত ২ জুন ঢাকা-ব্যাংককের একটি ফ্লাইটে (বোয়িং-৩৭৩) ভয়াবহ এ ঘটনা ঘটে। পাইলট ও গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের ভুলের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিমান ও সিভিল এভিয়েশন দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন যুগান্তরকে বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। তাকে জানানোও হয়নি। তিনি বলেন, এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনি সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেবেন বলেও জানান।

বিমানের এমডি ক্যাপ্টেন (অব.) এম মোসাদ্দিক আহম্মেদ বর্তমানে ট্রেনিংয়ের জন্য দেশের বাইরে আছেন। তার পদে দায়িত্ব পালন করছেন পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন (ডিএফও) ক্যাপ্টেন জামিল আহমেদ। এ ঘটনায় ক্যাপ্টেন জামিল কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

ওই দিন এয়ারক্রাফটির ক্যাপ্টেন ছিলেন পাইলট নিক্সন বাড়ই। নিয়ম অনুযায়ী ল্যান্ডব্যাক করার পর লগ বইতে পুরো ঘটনাটি পাইলটের লিখে রাখার কথা। কিন্তু পাইলট নিক্সন বাড়ই তা না করে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকৌশল বিভাগ তাদের লগ বইতে ওই ফ্লাইটের ল্যান্ডিং গিয়ারের গ্রাউন্ড সেফটি পিন খোলা না থাকার কথা উল্লেখ করলে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। ঘটনার ২ দিন পর বিমান কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরবর্তীতে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

দুটি তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় পাইলট ও গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের ভুল ছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় পাইলট ও সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির সুপারিশ করা হবে।

পাইলট নিক্সন বাড়ইয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি ফ্লাইট নিয়ে দেশের বাইরে থাকায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে পাইলটদের সংগঠন বাপা’র (বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশন) সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় পাইলট নিক্সন কোনোভাবেই দায়ী নন।

বিমানের প্রকৌশল বিভাগের জিএম হানিফ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় ইঞ্জিনিয়ার আশরাফকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় পাইলট ফ্লাই করে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করলে বাতাসের চাপে বের হয়ে থাকা বিমানের সব চাকা আকাশেই দুমড়ে-মুচড়ে উড়ে যেত। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও ছিল।

বোয়িং চেক লিস্ট ও পাইলটের লাইসেন্সিং শর্ত অনুযায়ী সব ধরনের ফ্লাইট উড্ডয়নের আগে পাইলট ও কো-পাইলট (ফার্¯¡ অফিসার) বিমানের চারদিকে ঘুরে ঘুরে (এক্সটার্নাল ইন্সপেকশন) সবকিছু হাতেকলমে দেখার কথা।

এর মধ্যে অন্যতম হল বিমানের চাকায় লাগানো সব সেফটি পিন খোলা হয়েছে কিনা, তা সরেজমিন দেখার পর নিশ্চিত হওয়া। শুধু ল্যান্ডিং গিয়ারের পিন খোলা হবে পাইলট ককপিটে বসার পর। এয়ারক্রাফট টেকঅফের আগমুহূর্তে গ্রাউন্ড টেকনিশিয়ানরা ওই পিনগুলো খুলে পাইলটকে দেখাবেন।

পাইলট ককপিটের মনিটরে পিনগুলো দেখে নিশ্চিত হলেই কেবল বিমানের ব্রেক ছাড়ার নির্দেশ দেবেন।

কিন্তু ওই ফ্লাইটের পাইলট ক্যাপ্টেন নিক্সন বাড়ই পিন না দেখেই ব্রেক ছাড়ার নির্দেশ দেন এবং ফ্লাইটটি বিপজ্জনকভাবে টেকঅফ (উড্ডয়ন) করান বলে জানা গেছে।

গত ২ জুন ঢাকা-ব্যাংককের একটি ফ্লাইটে (বোয়িং-৩৭৩) এ দুর্ঘটনা ঘটে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমানের সাবেক বোর্ড মেম্বার ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, বিমান প্রশাসনে এখন কোনো শক্তিশালী চালক নেই। এ ম্যানেজমেন্টের কথা কেউ শুনে না, পাত্তাও দেয় না। একটা ভঙ্গুর ম্যানেজমেন্ট।

তিনি বলেন, সাধারণত উড্ডয়নের আগে যে কোনো ফ্লাইটের সব চাকায় সেফটি পিন লাগানো থাকে, যাতে কেউ ভুল করেও চাকা উঠাতে না পারে। নিয়ম হল ফ্লাইটে যাওয়ার আগে এসব পিন খুলে ফেলতে হয় টেকঅফের পর যাতে চাকাগুলো গুটিয়ে ফেলা যায়। তার মতে, এ দায়িত্ব সাধারণত গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারদের।

চেক লিস্ট অনুযায়ী পাইলটের দায়িত্ব জাহাজে উঠার আগে এক্সটার্নাল ইন্সপেকশনের মাধ্যমে চাকার সেফটি পিনগুলো খোলা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া। কিন্তু বিমানের অনেক পাইলট আছেন যারা চেক লিস্টকে পাত্তা দেন না। আমাদের পাইলটরা লাস্ট মিনিটে এসে তাড়াহুড়া করে অনেক সময় ভালোভাবে চেক না করেই বিমানের ককপিটে গিয়ে বসেন।

নিয়ম অনুযায়ী পাইলটদের ফ্লাইটের ১ ঘণ্টা আগে এসে এসব ইন্সপেকশন করার কথা। কিন্তু অনেকেই এগুলো করেন না, অথবা কো-পাইলট দিয়ে করিয়ে থাকেন, যা নিয়মবহির্ভূত কাজ।

তার মতে, ওই ঘটনায় সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে ক্যাপ্টেন নিক্সন বাড়ই ঘটনার পর ফ্লাইট লগ বইতে পুরো বিষয়টি হাইড (লুকানো) করে গেছেন। ফ্লাইট লগ বইতে এ ঘটনা এন্ট্রি করেনি, যাতে কেউ জানতে না পারে। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে কিন্তু কোনো পাইলট লুকানোর চেষ্টা করেননি; তারপরও তাদের শাস্তি হয়েছে।

কিন্তু ক্যাপ্টেন নিক্সন বাড়ই বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) প্রভাবশালী সদস্য হওয়ায় পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি যাতে বিষয়টি হালকা করে না দেখেন তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শত শত মানুষের জীবন এসব পাইলটদের হাতে থাকে।

তবে বাপা সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুর যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় পাইলট নিক্সন কোনোভাবেই দায়ী নন। কারণ ল্যান্ডিং গিয়ারের পিন খোলা এবং তা দেখার দায়িত্ব পাইলটদের নয়। ককপিটে বসে পাইলট শুধু অন্য চাকাগুলোর সেফটি পিন খোলা হয়েছে কিনা তা দেখবেন। ল্যান্ডিং গিয়ারের পিন খোলার দায়িত্ব বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের।

তার মতে, ইতিমধ্যে তদন্তে এ ঘটনায় একজন ইঞ্জিনিয়ারের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত কমিটি ক্যাপ্টেন নিক্সনকেও শুনানিতে ডাকবেন। তখন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে।

কিন্তু বাপা সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুরের এ বক্তব্য মানতে নারাজ বিমান প্রকৌশল বিভাগের একজন শীর্ষ কর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের ওই প্রকৌশলী বলেন, যে কোনো ফ্লাইটের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী থাকেন পাইলট। পিন খোলার দায়িত্ব টেকনিশিয়ানদের, কিন্তু পিন খোলার নির্দেশনা ও পিন খোলা হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল পাইলটের। অন্য কারও নয়। এক্ষেত্রে পাইলট কোনোভাবে দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

এ ঘটনায় ইঞ্জিনিয়ারকে চাকরিচ্যুত করা হলে পাইলটের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতসহ ফৌজদারি মামলা করতে হবে। কারণ তার হাতে ছিল ওই ফ্লাইটের ২৭৩ যাত্রীর নিরাপত্তা।

তার মতে, যদি কোনো কারণে ওই ফ্লাইটটি জরুরি অবতরণ করতে না পারত কিংবা যদি ফ্লাইটটি বিশ্বের কোনো ব্যস্ত বিমানবন্দর থেকে টেকঅফ করত তবে যাত্রী নিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়তে হতো। স্পিড বেশি হলে এসব ক্ষেত্রে চাকাগুলো বাতাসের চাপে বিমান থেকে খুলে উড়ে যেত। এতে বিমানটি ক্র্যাশ করারও আশঙ্কা থাকত। তারপরও পাইলটকে বিমানের সব তেল পুড়িয়ে ল্যান্ডবেক করতে হয়েছে। এতে বিমানের মোটা অংকের টাকা ক্ষতি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালক ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন উইং কমান্ডার চৌধুরী জিয়া উল কবির যুগান্তরকে বলেন, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন। এ নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিভিল এভিয়েশনের একজন কনসালটেন্ট (ফ্লাইট অপারেশন) বলেন, নিয়ম অনুযায়ী এ ঘটনার পর পরই বিমানের উচিত ছিল পাইলট ও কো-পাইলটকে গ্রাউন্ডেড করা। এরপর তাদের ব্লাড টেস্ট করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু বিমান কর্তৃপক্ষ এসবের কিছুই করেনি।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button