জেলার সংবাদ

স্বজনদের আহাজারি থামছে না

ঢাকা, ১৭ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে নিহতদের স্বজনের আহাজারি থামছে না। চলছে চারদিকে হাহাকার। গতকাল শুক্রবার সকালে আরো দুটি মৃতদেহ উদ্ধার করে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। মৃতদেহ নিয়ে স্বজনদের কান্না থামছে না। রাঙ্গামাটির ভেদভেদী এলাকার বাসিন্দা লোকনাথ মন্দিরের নিচে পাহাড় ধসের ঘটনায় নিহত সুলতানা আক্তারের মৃতদেহ পাওয়া যায় বৃহস্পতিবার। একদিন পর শুক্রবার সকালে উদ্ধার করা হয় তার ছেলে ইব্রাহীমের লাশ। দুদিনের ব্যবধানে রাঙ্গামাটি সার্কিট হাউসের নিচ থেকে মা ও ছেলের মৃতদেহ উদ্ধারের পর মা ও ভাইয়ের মৃত্যু শোকে হাসপাতাল চত্বরে বিলাপ করছিল সুমী। তার পাশে দিশেহারা হয়ে ঘুরছিলেন স্বামী মুছা। সে সময় খবর আসে মুজিব নামে আরো একটি শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ শিশু হলো তাদের আদরের সন্তান। হাসপাতালে উদ্ধার কর্মীরা এ দুটি মৃত দেহ নিয়ে আসার পর এক বেদনাকাতর অবস্থার সৃষ্টি হয়। মা ভাই ছেলে হারিয়ে মুছা দম্পতি আর স্বজনদের কান্নায় বাতাস ভারি হয়ে উঠে। পাহাড় ধসে এত প্রাণহানির ঘটনায় গত চারদিনে রাঙ্গামাটি হাসপাতাল এলাকায় ছিল লাশের মিছিল আর স্বজনের আহাজারি। জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান জানান, চারদিনে এ পর্যন্ত সর্বশেষ মৃতের সংখ্যা ১১০।
ত্রাণ সহায়তা
জেলা প্রশাসক বলেন, এ পর্যন্ত ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনদের সহায়তার জন্য সরকারি ত্রাণ হিসাবে ৪১ লক্ষ টাকা, ২০০ মেট্টিক টন খাদ্যশস্য, ৫০০ বান্ডিল ঢেউটিন, ১৫ লক্ষ টাকা গৃহনির্মাণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিধসে নিহত ১০৯ জনের পরিবারের সদস্যদের জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা এবং ৩০ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়েছে। এদিকে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ভূমিধসে নিহত পরিবারের সদস্যদের পরিবার প্রতি ২ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদেক আহমেদ। অন্যদিকে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই রাঙ্গামাটির সঙ্গে চট্টগ্রামসহ বাইরের জেলাগুলোর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিকল্প উপায়ে চালু করার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার থেকেই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী।
উদ্ধার তৎপরতার সমাপ্তি ঘোষণা
গতকাল সন্ধ্যায় ফায়ার সার্ভিসের অতিরিক্ত পরিচালক গোলাম মোস্তফা সাংবাদিকদের জানান, তারা উদ্ধার তত্পরতার সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। এর আগে রাঙ্গামাটির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে আসেন পানি সম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে এক সভায় তিনি বলেন, রাঙ্গামাটিতে এ বর্ষায় আরো বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড় ধসে আর কোনো প্রাণহানি যাতে না ঘটে, সে জন্য পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সরিয়ে আনতে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
পাহাড় ধসের ঘটনায় সৃষ্ট দুর্যোগে রাঙ্গামাটিতে খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ যাতে স্বাভাবিক থাকে, সে জন্য রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই নৌ পথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা জরুরিভারে শুরু করার নির্দেশ দেন। এসময় সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদারসহ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা রাঙ্গামাটি সার্কিট হাউজের পেছন থেকে পানিতে ভাসমান অবস্থায় ১ পুরুষ ও লোকনাথ মন্দির এলাকায় মাটিচাপা অবস্থায় ১ শিশুর লাশ উদ্ধার করে।
বাজার অস্থিরতা না করতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান
এদিকে, শহরের বাজার ব্যবস্থা মনিটরিং করতে বনরূপা, রিজার্ভ বাজার ও তবলছড়ি বাজারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক একটি বাজার মনিটরিং টিম কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বাজারে অস্থিরতা তৈরি না করতে ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়ে মাইকিং করা হচ্ছে। মজুদকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাঠে কাজ করছে প্রশাসন।
তবে গত ১৫ জুন বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে। এতে পানি সংকট কিছুটা দূর হলেও গতকাল সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি এবং দুপুরের পরে ভারী বর্ষণ হওয়ায় বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে যাওয়ায় আবারো রাঙ্গামাটিতে বিদ্যুত্ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি বিদ্যুত্ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ কান্তি মজুমদার জানান, গতকাল আবারো বৃষ্টি হওয়ায় মাটি ধসে বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে গেছে। তাই বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, মানিকছড়ির শালবাগান এলাকায় রাস্তায় বিশাল ধস নামায় আমাদের নতুন করে কাজ করতে হচ্ছে। রাস্তায় কাজ করতে গেলে ঐ স্থানে আমাদের দুটি বিদ্যুতের পুল রয়েছে। আমাদেরকে দ্রুত এই দুটি পুল সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যেতে হচ্ছে। রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কসহ শহরের অভ্যন্তরীণ সড়ক চালু করতে রাঙ্গামাটি সড়ক বিভাগের শ্রমিকরা কাজ করে চলেছে।
মানিকছড়িতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ২৩ পরিবার আশ্রয় কেন্দ্রে
মানিকছড়ি (খাগড়াছড়ি) সংবাদদাতা জানান, গত দু’সপ্তাহ অবিরাম ভারী বর্ষণে মানিকছড়ির বিভিন্ন পাহাড়ে ভাঙন দেখা দেয়ায় প্রশাসন ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়ে ২৩ পরিবারকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এদিকে ভারী বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ভাঙার আশঙ্কায় শুক্রবার সকাল থেকে উপজেলা প্রশাসন মাঠে নেমেছে। উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে দ্রুত সরে যেতে প্রশাসনের মাইকিংয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর তত্পরতায় বিকাল নাগাদ দু’ছড়ি পাড়া ও মুসলিম পাড়ার দু’টি আশ্রয় কেন্দ্রে অন্তত ২৩ পরিবার আশ্রয় নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে গতকাল বিকালে জরুরিভাবে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ম্রাগ্য মারমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সকল ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, এনজিও প্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিক ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির খাগড়াছড়ি ব্রাঞ্চ মানিকছড়ি ইউনিটের সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button