জেলার সংবাদ

আবারো পাহাড় ধসের আশঙ্কায় রাঙ্গামাটি

ঢাকা, ১৮ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

আবারো পাহাড় ধসের আশঙ্কায় রাঙ্গামাটি। বৃষ্টির কারণে বেশ কিছু পাহাড়ে ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে আরো বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এসব ফাটল থেকে ধস নামতে পারে। এসব পাহাড়ের বেশকিছু স্থানে ঘর-বাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পর্যটন শহর রাঙ্গামাটির তিন দিনের মধ্যে চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে—জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের প্রধান।

এদিকে খাগড়াছড়ি শহরের বিভিন্ন পাড়া-গ্রামে ও বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া অব্যাহত রেখেছে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের একটি আশ্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি মানিকছড়ি উপজেলায়ও খোলা হয়েছে একটি আশ্রয় কেন্দ্র। ইতোমধ্যে সেখানে  ঝুঁকিতে বসবাসকারী বেশ কিছু পরিবারকে জেলার একাধিক  আশ্রয় কেন্দ্র্রে নিয়ে আসা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে খাবারসহ অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।

রাঙ্গামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ডিসি বাংলো, পুলিশ সুপারের বাংলো, বিএফডিসি রেস্ট হাউস, রাঙ্গামাটি সার্কিট হাউস, বাংলাদেশ বেতার ভবন, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, বাংলাদেশ টেলিভিশন রাঙ্গামাটি উপকেন্দ্রের স্থাপনাসমূহের জায়গায় বিশাল অংশজুড়ে ব্যাপক পাহাড় ধস হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে আরো বৃষ্টি হলে এসব এলাকায় আরো পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ের বেশকিছু স্থানে আরো অসংখ্য বাড়ি-ঘর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

রাঙ্গামাটি শহরের পর্যটন সড়ক, আনন্দ বিহার, পুরাতন হাসপাতাল, রিজার্ভ বাজার উন্নয়ন বোর্ড, সমাজ সেবা অফিস, রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমি, কল্যাণপুর, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, ভেদভেদী আনসার ক্যাম্প, বেতার কেন্দ্র, শিমুলতলী, ভেদভদী যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মনোঘর এলাকায় সড়কের বিশাল অংশ জুড়ে রাস্তার পার ধসে গিয়ে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিছু কিছু অংশে রাস্তা থেকে মাটির স্তূপ পড়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। এদিকে রাঙ্গামাটির ১২টি আশ্রয় কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। সেনাবাহিনী আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে পানি ও খাবার সরবরাহ করছে। শহরে বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে।

গত পাঁচ দিনে পুরো জেলায় পাহাড় ধসে নিহতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ১১৩। শুক্রবার রাতে জুরাছড়ি উপজেলার দুর্গম দুমদুমিয়া ইউনিয়নে দুটি মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয়রা। এ নিয়ে রাঙ্গামাটি সদরে ৬৬ জন, জুরাছড়ি উপজেলায় ৬ জন, বিলাইছড়ি উপজেলায় ২ জন, কাপ্তাই উপজেলায় ১৮ জন এবং কাউখালী উপজেলায় ২১ জন মোট ১১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ৩৩, মহিলা ৩২, পুরুষ ৪৮ জনের মরদেহ রয়েছে।

এদিকে পাহাড় ধসের পর রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক, রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক, রাঙ্গামাটি-বড়ইছড়ি ও রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীরা রাস্তার যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও রাঙ্গামাটি কাপ্তাই পানিপথে সীমিত আকারে পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের চিফ মেজর জেনারেল সিদ্দিকুর রহমান শনিবার রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও রাস্তা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিক জানিয়েছেন, রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে দ্রুত সংস্কার করে তিন দিনের মধ্যে হালকা যানবাহন ও এক মাসের মধ্যে ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা হবে।

এ সময় সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার ও রাঙ্গামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম ফারুক উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর শনিবার দুপুরে রাঙ্গামাটির পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও রাস্তা পরিদর্শন করেন। তিনি দুর্গতদের মাঝে খাবার বিতরণ করেন।

পরে প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর জেলা প্রশাসন সম্মেলন কক্ষে সমন্বয় সভায়, পাহাড়ের এই বিপর্যয়ে সমালোচনা না করে দলমত নির্বিশেষে সকলকে রাঙ্গামাটির দুর্গত মানুষের পাশে সহযোগিতার হাত নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে দ্রুত খাদ্য ও বস্ত্র সহায়তা দিতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি পরামর্শ দেন।

খাগড়াছড়িতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি তরুণ ভট্টাচার্য জানান, এক সপ্তাহেরও বেশি টানা বর্ষণে খাগড়াছড়ি জেলা সদরসহ ৯ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধস দেখা দিয়েছে। এ জেলায় পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছে অন্তত ২ সহস্রাধিক পরিবার। প্রাণহানির আশঙ্কায় স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। এর পরও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীরা সরে যেতে রাজি না হওয়ায় গত শুক্রবার খাগড়াছড়ি পৌর শহরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এলিশ শারমিনের নেতৃত্বে তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কলাবাগান, ন্যান্সিবাজার, শালবন, হরিনাথ পাড়া গ্যাপ, আঠার পরিবার এলাকা থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী ৩০টি পরিবারকে সরিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। অন্যদিকে মানিকছড়ি সদরে মুসলিম পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শনিবার সকালে একটি আশ্রয় কেন্দ্র্র খোলা হয়েছে। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিয়ে আসা হচ্ছে। আশ্রয় কেন্দ্রে ৩ বেলা খাবার ও নগদ অর্থ সাহায্য প্রদানসহ আশ্রয় কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, বিদ্যুত্, চিকিংসা সহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ।

আশ্রয় কেন্দ্র্র স্থায়ী সমাধান নয় উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক মোঃ রাশেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদস্থানে আপাতত সরিয়ে নেওয়া হলেও স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করার জন্য একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button