ধর্ম ও জীবন

অর্থ বুঝে কোরআন পড়ি জীবন গড়ি

ঢাকা, ১৮ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রমজান সেই মাস, যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে। যা সমগ্র মানব জাতির জন্য হেদায়াত, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। তোমাদের মধ্যে যে এ মাসের সাক্ষাৎ পাবে, সে যেন রোজা রাখে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)

কোরআন! এমনই এক অলৌকিক কিতাব, যার নামকরণই বলে দেয় এটি কতটা গুরুত্বের দাবি রাখে। কোরআনের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে অধিক পঠিত। পৃথিবীতে দ্বিতীয় এমন কোনো গ্রন্থ নেই যা কোরআনের মতো এত বেশি পাঠ হয়। কোরআন এমন এক অপরিবর্তিত সংবিধান, যা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে প্রেমময় বন্ধনকে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি মানবজীবনের ছোট থেকে ছোট, বড় থেকে বড় সব সমস্যার সমাধান করে থাকে। এর শাশ্বত বাণীগুলো কেউ যদি সঠিকভাবে বুঝে পড়ে এবং এর আলোকে জীবন গড়ে, তা হলে তার জীবন ভরে ওঠে শান্তির সুবাতাসে। তাকে গ্রাস করতে পারে না ভ্রান্তির কালো ছায়া; কিন্তু আফসোসের কথা হল জাতির বৃহৎ অংশই তা বোঝার জ্ঞান রাখে না বা চেষ্টা করে না। শুধু এ কারণেই মুসলমান আজ পশ্চাৎপদ জাতিতে পরিণত হয়েছে। পড়ে থাকতে হচ্ছে পেছনের সারিতে।

অন্যদিকে অমুসলিমরা এ কোরআন থেকে আহরণ করছে জগতের সব রহস্যের সমাধান, তথ্য-উপাত্ত। এ কোরআনের জ্ঞানেই তারা পাড়ি দিচ্ছে পৃথিবীর সীমানা। পা রাখছে অন্য গ্রহে। উন্মেষ করছে নতুন দিগন্তের পথ। কী নেই এ কোরআনে? দেহ থেকে শুরু করে সাগর, মহাসাগর মহাকাশসহ দৃষ্টিগোচর আর দৃষ্টির বাইরে সব সৃষ্টির রহস্যই যে রয়েছে এ কোরআনে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কাফেররা কী ভেবে দেখে না, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না? (সূরা আম্বিয়া : ৩০)

এ আয়াতটিতে তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বের উৎপত্তির তত্ত্ব। এখানে যে পৃথক করার কথা বলা হয়েছে তা বিজ্ঞানীদের কথিত ‘বিগ ব্যাংক’ তত্ত্বের রহস্য। অপর আয়াতে তিনি বলেন, ‘অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।’ (সূরা হামীম সেজদাহ : ১১) এখানেও ‘ধূম্রপুঞ্জ’ শব্দটি সৃষ্টির আদি অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছে। যা ছিল গরম গ্যাসের পিণ্ড। যাতে বস্তুকণা দ্রুত ছোটাছুটি করছিল ধোঁয়ার মতো। এ থেকেই তৈরি হয় গ্রহ, নক্ষত্র এবং আমাদের পৃথিবী।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোরআন শুধু একটি ধর্মগ্রন্থই নয়, বরং এটি একটি মহাবিজ্ঞানও। অপরদিকে এ কোরআন এসেছে আমাদের আলোর পথ দেখানোর জন্য। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য। এখন এ কোরআনই যদি আমরা না বুঝি তা হলে আলোর পথের আশা করি কীভাবে? হ্যাঁ, কোরআন না বুঝে পড়লেও পুণ্য হয়, কিন্তু লক্ষ্য পূরণ হয় কি? কোরআন তেলাওয়াত করাই যে উম্মতের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার আদেশ-নিষেধগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সে অনুযায়ী আমল করাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। কোরআন পড়ার আরেকটি উদ্দেশ্য হল আল্লাহতায়ালার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। কিন্তু সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে কি? কোরআন শুধু পড়ার জন্যই নয়, বরং তা গবেষণা করাই অপরিহার্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা কি কোরআন নিয়ে গবেষণা করে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা মেরে দেয়া হয়েছে?’ (সূরা মুহাম্মাদ- ২৪)

এই যে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কিরাত পড়ছি, কিন্তু কী পড়ছি তা কি কখনও বোঝার চেষ্টা করেছি? এ বুঝতে না পারার কারণেই কিন্তু নামাজে আমাদের আত্মতৃপ্তি আসে না। কারণ যা পড়ছি তা না বোঝার কারণে আমাদের হৃদয় আলোড়িত হচ্ছে না। অথচ সাহাবিরা নামাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন। তারা নামাজে মনোনিবেশ করে তুষ্টি পেতেন, আল্লাহর সান্নিধ্য পেতেন। তাদের মতো নামাজের মধ্যে আমাদেরও সেই তৃপ্তি প্রয়োজন নয় কি? অনেকেই মনে করেন কোরআন বোঝা যেন একটি অসম্ভব কাজ। অথচ আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি? (সূরা ক্বামার : ১৭)

রমজানে দেশের অধিকাংশ মসজিদেই খতম তারাবিহ হচ্ছে। আমরা এ সুযোগটাও কোরআন শেখার কাজে লাগাতে পারি। তারাবিতে এক খতম কোরআন পড়া হয়। প্রত্যেক দিনের পঠিত কোরআনের সার সংক্ষেপ যদি মুসল্লিদের কাছে পেশ করা হয়, তা হলে আশা করা যায় কোরআন শোনার পাশাপাশি তারা এর মর্মার্থও উপলব্ধি করতে পারবেন। এভাবে এক-দু’বছর, অথবা তিন চার বছরে সাধারণ মুসল্লিরাও কোরআনের মৌলিকত্ব বুঝে নিতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। হ্যাঁ ব্যাপারটা শুরুতে একটু কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু কোরআন বোঝার বা বোঝানোর ইচ্ছা থাকলে তা আটকে থাকবে না। আর এ দ্বায়িত্বটা নিতে হবে আলেমদেরই। কেন না তারা সমাজের প্রতিনিধি। সমাজ বদলে তাদেরই অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখতে হবে। এই যে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ খতমে তারাবিহ পড়ার পরও জাতি কোরআন বুঝতে পারল না তার জন্য কি তারাও জিজ্ঞাসিত হবেন না?

এই যে পৃথিবীজুড়ে মুসলমানরা আজ নিপীড়িত হচ্ছে, এর অন্যতম কারণও কিন্তু এই কোরআন ছেড়ে দেয়া বা না বোঝা। এ জন্যই নবীজি কোরআনকে আঁকড়ে ধরতে বারবার তাগিদ দিয়ে গেছেন। হজরত যুবাইর ইবনে মাত’আম (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জুহফা নামক স্থানে রাসূল (সা.) এর সঙ্গে ছিলাম। তখন রাসূল (সা.) বললেন, ‘তোমরা কী সাক্ষ্য দিচ্ছ না, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল আর এ কোরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত?’ আমরা বললাম, অবশ্যই সাক্ষ্য দিচ্ছি। তখন রাসূল (সা.) বললেন ‘তা হলে তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, নিশ্চয় এ কোরআনের একদিক আল্লাহর হাতে অন্যদিক তোমাদের হাতে। সুতরাং তোমরা তা ভালোভাবে আঁকড়ে ধর তা হলে তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট হবে না এবং ধ্বংস হবে না।’ (তিবরানী )

সুতরাং আমাদের উত্তরণের পথ কিন্তু ওই একটাই। আর তা হচ্ছে কোরআনের পথ। তাই আসুন! আমরা কোরআনকে বোঝার চেষ্টা করি এবং কোরআনের আলোয় পুরো পৃথিবীকে আলোকিত করি।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button