মুক্তমত

সংযমের মাসে অপচয়ের মহোৎসব

ঢাকা, ১৯ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

রোজা মুসলমানদের অবশ্য পালনীয় পাঁচ ইবাদতের একটি। রমজান রহমত, বরকত আর মাগফেরাতের মাস। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীদের কাছে রমজান খুবই পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসেই নাজেল হয়েছিল মহাগ্রন্থ আল কোরান। রমজান মানুষকে মূলত সংযম শিক্ষা দেয়। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রমজান মাসে এলে জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত রাখা হয়, জাহান্নামের দ্বারসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।’ এত গুরুত্বপূর্ণ রমজান মাসের মূল ইবাদত হলো রোজা।

দৃশ্যত রোজা হলো, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা। কিন্তু রোজার মূল চেতনা হলো সংযম। সেই সংযম শুধু না খেয়ে থাকার সংযম নয়, এ সংযম হলো আত্মশুদ্ধির। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মাৎসর্য্য- ষড়রিপু থেকে নিজেকে সংযত রাখাই, পরিপুর্ণ সংযম; শুধু জিহ্বার সংযম নয়, হতে হবে আত্মার সংযম। কী করলে রোজা ভাঙবে, কী করলে রোজা পোক্ত হবে; তার বিস্তারিত বিবরণ আছে ধর্মে। কিন্তু আমরা খালি সকাল-সন্ধ্যা উপোস থাকাকেই রোজা হিসেবে ধরে নিয়ে আত্মপ্রসাদে ভুগি। মুখে বলিও, এবার অনেক গরম পড়েছে, এবার দিন বড়, রোজা রাখতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।

সারাবছর পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ পড়েন না, কিন্তু রমজানে খতমে তারাবিতে মসজিদে নিয়মিত যান, এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। কেউ ভাববেন না, আমি কাউকে খতমে তারাবি পড়তে নিরুৎসাহিত করছি। আমি খালি বলতে চাইছি, ইসলামে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ, মানে অবশ্য কর্তব্য। তারাবি ফরজ নয়, তবে পড়লে অনেক সওয়াব হবে। আর প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়লে গুনাহ হবে। তাই আগে বছরজুড়ে আল্লাহর বিধান মেনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে প্রকৃত মানুষের মত জীবন যাপন করা সব মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। শুধু এক মাসের জন্য মৌসুমী মুসলমান হওয়া কতটা কার্যকর তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে রমজানে সংযমের যে ধারণা, তার সাথে সংযমের প্রকৃত চেতনার মিল খুব সামান্যই।

আমি অনেককে চিনি, যারা রোজা রেখে সারাদিন সময় কাটান হিন্দি সিনেমা দেখে। চিত্তের সংযম তিনি কতটা রাখতে পারছেন? রোজা রেখে ঘুষ খান, মিথ্যা কথা বলেন, মানুষের ক্ষতি করেন, দুর্নীতি করেন; এমন মানুষ তো ভূরি ভূরি। বরং রমজান এলে ঘুষের রেট বেড়ে যায়। পুলিশের ঈদ বাণিজ্য চলে দেদারসে। ইফতার পার্টির নামে মাসজুড়ে চলে দারুণ রাজনীতি। এসব আয়োজনে রাজনীতিবিদরা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা নানা অভিযোগ তোলেন। অন্য দেশের কথা জানি না, বাংলাদেশে রমজানে সবচেয়ে অসংযমী আচরণ হয়। রমজান এলেই ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেন নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের। অন্য সব রিপু সংযমের কথা না হয় বাদই দিলাম, খালি খাওয়ার সংযমের কথাই যদি বলি, তাহলেও এরচেয়ে অসংযমের মাস আর নেই। অন্য সাধারণ মাসের তুলনায় রমজানে খাওয়ার পেছনে আমাদের দেশের মানুষের খরচ অনেক বেশি হয়।

রমজানে আমরা এমন অনেক খাবার খাই, যা সারাবছর খাইনা। আরবের খোরমা খেজুর ছাড়া আমাদের ইফতার হয় না। ছোলা, বেগুনি, জিলাপি, হালিম- এমন অনেক আইটেম আছে; যা সারা বছরে যা বিক্রি হয়, রমজানে হয় তার কয়েকগুণ বেশি। এই যে ইফতার মাহফিলের কথা বললাম, এটা অসংযম আর অপচয়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। প্রতিদিন ঢাকায় অসংখ্য ইফতার মাহফিল হয়। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ইফতার মাহফিলের দাওয়াত থাকে। ঢাকার অসহনীয় যানজট ঢেলে এসব ইফতার আয়োজনে যেতে ভালো লাগে না আমার। যানজট আসলে অজুহাত। আসলে এসব ইফতার আয়োজনে অপচয়ের মহোৎসব দেখতে আমার কুৎসিত লাগে লাগে, তাই যাই না। এসব ইফতার আয়োজনে থাকে হরেক আইটেম। ইফতার শেষ হওয়ার সাথে সাথেই থাকে ব্যাক টু ব্যাক ডিনারের আয়োজন। এসব আয়োজনে কার আইটেম কয়টা তা নিয়ে রীতিমত প্রতিযোগিতা হয়। কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের পক্ষেই সব কিছু খাওয়া সম্ভব হয় না। বাড়তি অংশ ফেলনাই হয়।

ইফতারের সময় ঢাকার কোনো রেস্টুরেন্টেই বসার জায়গা পাওয়া যায় না। দেখে মনে হবে, কেউ বুঝি ঘরে ইফতার করেন না। পাঁচ তারকা রেস্টুরেন্টে ইফতার আয়োজনে যে কোনো নিষ্ঠাবান মুসলমানের মন খারাপ হয়ে যাবে। অন্তত একশো আইটেমের বুফে। কয়টা মানুষ ছুঁয়ে দেখতে পারবে? অথচ এখনো দেশের কত মানুষ দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোগাড় করার জন্য কত কষ্ট করে। আগে দেখতাম রোজার সময় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত থাকে। এখন উল্টো। সারাদিন বন্ধ থাকলেও ইফতার আর সেহরীতেই পুষিয়ে যায়। ইফতারের সময় অভিজাত যে কোনো রেস্টুরেন্টে গেলেই জানতে চাইবে, বুকিং আছে কিনা। বুকিং ছাড়া আপনি জায়গা পাবেন না। ইদানীং ঢাকায় আরেক সংস্কৃতি চালু হয়েছে সেহরি পার্টি। মধ্যরাতের পর যেন জেগে ওঠে ঢাকার নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকা।

জমজমাট সেহরি পার্টিতে গাড়ির লম্বা লাইন লেগে যায়। অনেকে রেস্টুরেন্টে বসার জায়গা পাওয়া যায় না। যুদ্ধ করে সেহরি খাওয়া শেষে বাসায় ফিরে ফজর নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে পড়েন অনেকে। ইফতারের মত সেহেরীতেও বুকিং দিতে হবে। আগে বুকিং না দিলে, আপনি সত্যি সত্যি প্রয়োজনে রেস্টুরেন্টে সেহেরী খেতে চাইলেও পারবেন না। এখন ঢাকার শপিংমলগুলোতে পা ফেলার জায়গা নেই। মানুষ দেদারসে কেনাকাটা করছে। দেখে মনে হয়, সত্যি বাংলাদেশে মধ্যম আয়ের দেশ হতে আর বাকি নেই। কিন্তু শপিং শেষে বেরিয়ে সামনের রাস্তায় শিশুদের ভিক্ষা করতে দেখলে বুঝি কতটা ফাঁকি আর কতটা বৈষম্য এই চাকচিক্যে। আলোর নিচেই লুকিয়ে থাকে কতটা অন্ধকার। সংযমের মাসেই চলে কতটা অসংযম আর অপচয়।

আমাদের সবকিছুতেই দেখনদারিটা অনেক বেশি। আমরা যে কবে দেখনদারি থেকে ধর্মকে আত্মার কাছে নিতে পারবো? কবে যে খাওয়া আর সোশ্যাল স্ট্যাটাসের প্রতিযোগিতা ছেড়ে ভালো মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামবো? হে সৃষ্টিকর্তা, তুমি আমাদের হেদায়েত করো।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button