আলোচিত সংবাদ

তবু ছেলেদের সঙ্গেই ঈদ করতে চান সেই মরিয়ম নেছা

ঢাকা, ২৩ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

‘ছেলে ও ছেলের বউ আছে, আছে নাতি-নাতনিরা। স্বামীর ভিটায় ফিরমু আমি, ঈদ করমু সবাইরে সঙ্গে নিয়ে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে আর মন চায় না।’ ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৮নং কেবিনের বিছানায় শুয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন মরিয়ম নেছা।

এই মরিয়ম নেছা হলেন সেই ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা; সন্তানদের অবহেলায় যার ঠাঁই হয়েছিল গোয়াল ঘরে, পরে শেয়ালের কামড় খেয়ে যিনি ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। গত ২৭ মে রাতে একদল শেয়াল তার বাম পায়ের বেশ কয়েক জায়গা কামড়ে খুবলে নেয়। খবর পেয়ে ২৯ মে জেলা সমাজসেবা অধিদফতর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে প্রায় এক মাস ধরে তার চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে।

চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে মরিয়ম নেছা সম্পূর্ণ সুস্থ। তার প্রতি সন্তানদের অবহেলার বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের নজরে আসায় তাকে সরকারি বৃদ্ধাশ্রমে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু মরিয়ম নেছা সরকারি বৃদ্ধাশ্রমে যেতে চাইছেন না। হাসপাতালে ভর্তির ২৬ দিনের মাথায় ছেলে ও ছেলে বউয়ের জঘন্য অপরাধ ভুলে তিনি এখন তাদের কাছে গিয়ে ঈদ করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন।

মরিয়ম নেছার দাবি, ‘ছেলে আর ছেলের বউ আমার সঙ্গে আর খারাপ ব্যবহার করবে না। বাড়িতে গেলেই আমি ভাল থাকব। স্বামীর ভিটায় মরতে চাই আমি।’

হাসপাতালে মরিয়ম নেছার পাশে ছোট ছেলে (ছবি- ময়মনসিংহ প্রতিনিধি)

স্বামী মোসলেম উদ্দিন মারা যাওয়ার পর পালাক্রমে তিন মাস করে তিন ছেলের বাড়িতে থাকছিলেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের তেজপাটুলী গ্রামের মরিয়ম নেছা। সম্প্রতি তিন মাস পূর্ণ হওয়ার ২০ দিন আগেই ছোট ছেলে মারফত আলীর বাড়িতে মরিয়ম নেছাকে রেখে যায় মেজো ছেলে মোবারক আলী। মারফতের বাড়িতে তার বৃদ্ধা মাকে থাকতে দেওয়া হয় গোয়াল ঘরে গরুর সঙ্গে।

ছোটছেলে মারফত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ভুল করেছিলাম, এখন আমরা আমাদের ভুল বুঝতেও পারছি। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে নিজেরা যে ঘরে থাকি সে ঘরেই মাকেও থাকতে দেবো।’

প্রতিবেশী নাসরিন বেগম বলেন, ‘বৃদ্ধাকে শেয়ালে কামড়ানোর ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। হাসপাতালের ডাক্তাররা বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলেছেন। এখন তিনি সুস্থ হয়ে উঠায় আমরা খুশি। মরিয়ম নেছা বাড়ি যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছেন বলে শুনেছি।’

মরিয়ম নেছা সুস্থ হয়ে উঠলেও তাকে এখনই ছাড়পত্র দিচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মরিয়ম নেছা কোথায় গিয়ে উঠবেন, এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা আসার আগ পর্যন্ত তাকে হাসপাতালেই থাকতে হবে।

এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. লক্ষ্মীনারায়ণ মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মরিয়ম নেছা বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ। আগামী ২৫ জুন তাকে শেষ ভ্যাক্সিন দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে হাসপাতাল থেকে ছাড় পেয়ে তিনি কোথায় গিয়ে উঠবেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে হাসপাতালেই থাকতে হবে।’

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে মরিয়ম নেছা (ছবি- ময়মনসিংহ প্রতিনিধি)

হাসপাতালের সমাজসেবা কর্মকর্তা শাহনাজ আক্তার বলেন, ‘মরিয়ম নেছার ব্যাপারটি সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল জানে। তাকে হাসপাতালে ভর্তির পর জেলা প্রশাসক মো. খলিলুর রহমান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিনের নির্দেশনা ছিল, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলে তাকে সরকারি বৃদ্ধাশ্রমে রাখা হবে। এখন মরিয়ম নেছা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। পরিবারের লোকজন তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশনা ছাড়া তাকে আমরা কোথায় যেতে দিতে পারবো না।’

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button