মুক্তমত

মিয়ানমারের বিচার করা কি সম্ভব?

ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর,(ডেইলি টাইমস ২৪):

খবরটা শুনতে ভালো যে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোসহ আরও অনেক অপরাধে মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আন্তর্জাতিক গণ-আদালত। কিন্তু প্রশ্ন হলো,¸তাতে মিয়ানমারের কী আসে-যায় বা তারা আদৌ এই বিচারকে পাত্তা দেয় কি না কিংবা যে বিচারের আন্তর্জাতিকভাবে অপরাধ আদালত (আইসিসি) স্বীকৃতি আইনি ভিত্তি নেই, সেই বিচার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখবে কি না?

আমাদের মনে আছে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য শহীদজননী জাহানার ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং এর তিন দিন পরে গঠিত হয় ঘাতক দালাল নির্মূল সমন্বয় কমিটি। ওই বছরের ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত এজলাস মঞ্চ থেকে বাংলাদেশ গণ-আদালত-১-এর চেয়ারম্যান হিসেবে জাহানারা ইমাম একটি রায় ঘোষণা করেন যে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের জন্য গোলাম আযমের যথাযথ বিচার হওয়া উচিত। এর ২১ বছর পরে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মধ্যে ৫টি প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে গণ-আদালতের ওই রায় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। সুতরাং রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক গণ-আদালত যে রায় ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তার যে কোনো গুরুত্ব নেই, তা নয়।

১৮ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, বিভিন্ন প্রামাণ্য দলিল ও সাক্ষ্য গ্রহণের ভিত্তিতে ২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে মালয়েশিয়ার মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের মিলনায়তনে জনাকীর্ণ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওই রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের বিভিন্ন অংশ পারমানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনালের সাতজন বিচারক ভাগ করে পাঠ করেন। তবে রায়ের অপারেটিভ বা কার্যকর অংশ পাঠ করেন অস্ট্রেলীয় বিচারক জিল এইচ বোয়েরিঙ্গার। সর্বসম্মতিক্রমে দেওয়া এই রায়ে ১৭টি সুপারিশ করা হয়। এতে মিয়ানমারের ওপর অবিলম্বে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মিয়ানমারের সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিদের বিদেশে থাকা ব্যাংক হিসাব বাজেয়াপ্ত, মিয়ানমারের বাইরে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

মনে রাখা দরকার, এই রায় যেদিন ঘোষণা করা হয়, সেদিন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলছিল এবং সকালে দেশটির উপদেষ্টা অং সান সু চি ভাষণ দেন জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের লক্ষ্য করে। তা বস্তুত রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে নির্জলা মিথ্যা ছিল বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এসেছে। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার বিশ্বজনমতকে পাত্তা দিচ্ছে না বলে মনে হলেও বা ‘আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার ভীত নয়’ বলে সু চি তাঁর ভাষণে দাবি করলেও ভেতরে-ভেতরে তারা যে একধরনের চাপ ঠিকই অনুভব করছে, তা স্পষ্ট। সুতরাং মালয়েশিয়ায় ইতালিভিত্তিক গণ-আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে মিয়ানমারের প্রত্যক্ষ কোনো ক্ষতি না হলেও এটি বিশ্বজনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে।

এখন এই জনমতকেই আমরা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারি, সেটিই চ্যালেঞ্জ এবং সে ক্ষেত্রে গণ-আদালতের এই রায় আমাদের পথ দেখাতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের সরাসরি ভিকটিম হিসেবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টে (আইসিসি) মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করতে পারে।

রোম স্ট্যাটু অব ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট ১৯৯৮-এ বলা হয়েছে, ‘যেসব সদস্য দেশ রেকটিফাই করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) পূর্ণাঙ্গ সদস্য হয়েছে, তারা যদি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ করে, তাহলে আইসিসি তাদের বিচার করতে পারবে।’ কিন্তু মিয়ানমার এতে রেকটিফাই না করলেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি রেজল্যুশন পাস করে সরাসরি আইসিসিকে বিচারের জন্য বলতে পারে। আবার কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে আইসিসি স্বপ্রণোদিত হয়েও অনুসন্ধান করে মামলা নিতে পারে। এর বাইরে যেহেতু মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, তাই ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) গিয়ে রোহিঙ্গাদের খাবার, আশ্রয়, ভরণপোষণ চেয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে।

আইসিসি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠন আইসিসির প্রসিকিউটরের (ওপিপি) অফিসে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য পাঠাতে পারে। এটি পোস্ট, ফ্যাক্স বা ই-মেইলেও (otp.informationdesk@icc-cpi.int) পাঠানো যায়। আইসিসির প্রসিকিউটর অফিস বিষয়টি আমলযোগ্য মনে করলে তারা অভিযোগের তদন্ত করবে। রোহিঙ্গা ইস্যুটি যেহেতু এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ চালাচ্ছে বলে খোদ জাতিসংঘও স্বীকার করেছে, সুতরাং আইসিসির পক্ষে স্বপ্রণোদিত হয়েই এর অনুসন্ধান করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্ত পাস করবে কি না, তা অনিশ্চিত। কারণ, পরিষদের শক্তিশালী দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া কার্যত মিয়ানমারের পক্ষে। কিন্তু তারপরও আইসিসিতে বাংলাদেশের তরফে কোনো নাগরিক, আইনজীবী বা মানবাধিকারকর্মী রাখাইনে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্য-উপাত্তসহ একটি অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।

আশার সংবাদ হলো, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ সাত দেশ। বাকি দেশগুলো হচ্ছে ফ্রান্স, মিসর, কাজাখস্তান, সেনেগাল ও সুইডেন। আরও আশার খবর, আহ্বান জানানো এই সাত দেশের মধ্যে তিনটিই (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। নিরাপত্তা পরিষদের বাকি দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখন পর্যন্ত বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চীন, রাশিয়া ও ভারত ছাড়া বাকি সবাই, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও মিয়ানমারের বিপক্ষে। সুতরাং নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাধ্য করা, এমনকি তাদের বিচারের মুখোমুখি করা অসম্ভব নয়।

কেউ কেউ এও মনে করেন, বাংলাদেশের আইনেও মিয়ানমারের বিচার করা সম্ভব। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুসারে কোনো ঘটনার বিচার করতে হলে অপরাধটি বাংলাদেশে সংঘটিত হতে হবে বলে বিধান থাকলেও আইনের সর্বজনীন এখতিয়ারও রয়েছে। সে অনুযায়ী অন্য দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা যেহেতু বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাই বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর অভিযুক্ত সদস্যদের বিচার করা যায়; যদিও সেটি খুব সহজ নয়। বরং রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর অভিযুক্ত সদস্যদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতই ভরসা। সে ক্ষেত্রে গণ-আদালতের রায় হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স। কেননা, যেসব মানুষ হত্যা, ধর্ষণসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য ন্যায়বিচারের স্বার্থে শুধু রোহিঙ্গা সংকট সমাধানই নয়, বরং মিয়ানমার সরকার ও দায়ী সেনাসদস্যদের বিচারও জরুরি।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button