বাপেক্সের মহাপরিকল্পনা বাতিল, সব প্রকল্প সংশোধনের নির্দেশ

0
89

ঢাকা , ১৩ ফেব্রুয়ারি , (ডেইলি টাইমস২৪):

রাষ্ট্রীয় তেল গ্যাস অনুসন্ধান উত্তোলন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) ১০৮ কূপ খনন করার মহাপরিকল্পনা বাতিল করে দিয়েছে সরকার। জ্বালানি বিভাগ মনে করছে, প্রকল্প প্রণয়নে বাপেক্সের ঘাটতি রয়েছে। নতুন করে আবার সব প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে জ্বালানি বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী তেল গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এখন থেকে অধিক সম্ভাবনাময় এলাকায় বছরে দুই থেকে তিনটি কূপ খনন করবে বাপেক্স।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, রূপকল্প-১ এর অধীনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সালদা নর্থ-১ এর অনুসন্ধান কূপের কাজ শেষ হলেও কোনও গ্যাস পাওয়া যায়নি। এছাড়া রূপকল্প-৩ এর অধীনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা-১ এর খনন কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস পায়নি বাপেক্স। আর এর আগে পাবনার মোবারকপুরেও কূপ খনন করে শূন্য হাতে ফিরে আসে বাপেক্স। এরও আগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কূপ খনন করে অতিসামান্য একটি রিজার্ভ আবিষ্কার করে বাপেক্স—যা জ্বালানি বিভাগকে হতাশ করেছে।

এ তিনটি কূপ খনন করার পরই মূলত জ্বালানি বিভাগের টনক নড়ে। দুটি কূপ খনন করে বিপুল পরিমাণ গচ্চা দেওয়ার পর এখানে গ্যাস অনুসন্ধানে করা সিসমিক সার্ভে রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। যথেষ্ট গ্যাস পাওয়া যাবে না অথবা একেবারে কিছুই পাওয়া যাবে না জেনেও গ্যাস কূপ খনন করা হয়েছিল বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা মনে করেন। এরপরই প্রকল্পগুলো সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এ বিষয়ে বলেন, একের পর এক কূপ খনন করাটা যৌক্তিক নয়। সেগুলো থেকে কেমন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে সেটিও দেখা দরকার। এজন্য আবার এই ১০৮টি কূপের যে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পর্যালোচনা করবো। নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে জানতে চাইলে বাপেক্স এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, আগের ১০৮ কূপ খননের প্রস্তাব বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এখন নতুন করে আবার সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে। বাপেক্স এখন থেকে সম্ভাবনাময় এলাকায় বছরে দুই থেকে তিনটি কূপ খনন করবে।

পেট্রোবাংলা জানায়, গ্যাসের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে ২০২১ সালের মধ্যে বাপেক্স ১০৮টি কূপ খনন করার প্রস্তাব দেয়। এরমধ্যে ৫৩টি অনুসন্ধান কূপ। যা একেবারে নতুন এলাকায় খনন করার কথা বলা হয়। অর্থাৎ যেখানে আগে কূপ খনন করা হয়নি। এছাড়া ৩৫টি উন্নয়ন কূপ খনন করার পরিকল্পা জমা দেওয়া হয়। এর আগে গ্যাস পাওয়া গেছে এমন ক্ষেত্রে সাধারণত উন্নয়ন কূপ খনন করা হয়। পরিকল্পনার মধ্যে ২০টি কূপে ওয়ার্কওভার করার কথা বলা হয়। প্রসঙ্গত আগে থেকে গ্যাস তোলা হচ্ছে এমন কূপে কোনও কারণে গ্যাস তোলার পরিমাণ কমে গেলে সে কূপে নতুন খননকে ওয়ার্কওভার বলা হয়।

অথচ বাপেক্সের এই পরিকল্পনা প্রণয়নের শুরু থেকেই সংশ্লিষ্টরা বলছিলেন এতে গলদ রয়েছে। নতুন করে ৫৩টি অনুসন্ধান কূপ করতে হলে ৫৩টি কাঠামো (স্ট্রাকচার) নির্ধারণ করা জরুরি ছিল। কিন্তু আদৌ সারাদেশে এই সময়ের মধ্যে ৫৩টি স্ট্রাকচার প্রয়োজন কিনা এবং তা এত অল্প সময়ে খনন করার জন্য উপযোগী কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে চলমান সবগুলো রূপকল্পই সংশোধন করার নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। বাপেক্স সূত্র জানায়, রূপকল্প-১ এর আওতায় তিনটি অনুসন্ধান ও দুইটি উন্নয়ন কূপ খনন করার কথা। এরমধ্যে অনুসন্ধান কূপ হচ্ছে হারারগঞ্জ -১, শ্রীকাইল ইস্ট-১ এবং সালদা নর্থ -১ এ। অন্যদিকে দুইটি উন্নয়ন কূপের মধ্যে আছে শ্রীকাইল নর্থ-২ এবং কসবা-২। এই প্রকল্পের অধীনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এডিপি থেকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরমধ্যে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা—যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৫ শতাংশ।

জানা যায়, সালদা নর্থ-১ এর অনুসন্ধান কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এখানে কোনও গ্যাস পাওয়া যায়নি। শ্রীকাইল ইস্ট-১ এর অনুসন্ধান কূপের ভূমি উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ চলছে বলে বাপেক্স জানিয়েছে। রূপকল্প-২ এর অধীনে ছিল ৪টি অনুসন্ধান কূপ। এগুলো হচ্ছে সালদা নদী দক্ষিণ-১, সেমুতাং দক্ষিণ-১, বাতচিয়া-১ এবং সালদা নদী পূর্ব-১। এতে ২০১৮১-১৯ অর্থ বছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। রূপকল্প-৩ এর অধীনে ৪টি অনুসন্ধান কূপ করার কথা ছিল। এরমধ্যে ছিল কসবা-১, মাদারগঞ্জ -১, জামালপুর-১, ও শৈলকূপা-১। এজন্য এডিপিতে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

জানা যায়, এর আগের অর্থ বছরে কসবা-১ এর খনন কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখান থেকে পাওয়া গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের সম্ভাবনা নেই। মাদারগঞ্জ-১ এর খননের জন্য আজারবাইজানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। রাস্তা ও ভূমি উন্নয়ন কাজ চলছে। রূপকল্প-৫ এর আওতায় দুইটি অনুসন্ধান কূপ, একটি মূল্যায়ন কূপ, এবং একটি ওয়ার্কওভার কূপ করার পরিকল্পনা ছিল। এই প্রকল্পের জন্য এডিপি’র বরাদ্দ ছিল ৩০ কোটি টাকা।  অনুসন্ধান কূপের মধ্যে ছিল শ্রীকাইল নর্থ-১, মোবারকপুর সাউথ ইস্ট-১ এবং মূল্যায়ন কূপ করার কথা ছিল বেগমগঞ্জ-৪-এ। এছাড়াও ওয়ার্কওভার করার কথা বেগমগঞ্জ-৩ এ। এরমধ্যে বেগমগঞ্জ-৪ এর উন্নয়ন কাজ মূল্যায়ন কূপের জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বেগমগঞ্জ-৩ এর কাজ শেষ। শ্রীকাইল নর্থ-১ এর জমি অধিগ্রহণ, সংযোগ সড়ক নির্মাণ এবং ভূমি উন্নয়ন শেষ হয়েছে। মোবারকপুর সাউথ ইস্ট-১ এর কূপের জমি অধিগ্রহণ হয়েছে।

অর্থাৎ এতদিন প্রকৃত ঘটনা চেপে রাখলেও প্রকল্পগুলোর কাজ আপাতত বন্ধ করে দেওয়ার চিত্র বাপেক্সের এই প্রতিবেদনেই ফুটে উঠেছে। গত জানুয়ারি মাসের  মাঝামাঝি সময়ে জ্বালানি বিভাগে এই প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছে বাপেক্স।

গ্যাস কূপ খননে এডিপি বরাদ্দের বাইরেও গ্যাস উন্নয়ন তহবিল এবং বাপেক্স’র নিজস্ব অর্থও ব্যয় করা হয়। যেহেতু রূপকল্প-১, ২ এবং ৩ সংশোধন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাই সেসব ব্যয়ও আপাতত বন্ধ আছে।

প্রসঙ্গত একটি কূপ খননে বাপেক্স ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান হোসেন মনসুর বলেন, ‘১০৮টি প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত হয়নি। এতগুলো প্রকল্প একসঙ্গে নেওয়া ঠিক হয়নি। যে কয়টি কূপ খনন করা হয়েছে সেগুলোতেও ঠিকমতো কাজ করা হয়নি। আরও ভালো করে খননের প্রয়োজন ছিল। আর কূপ খননে ঝুঁকি তো থাকবেই, তাই বলে বসে থাকতে হবে নাকি? বাপেক্সের এখন অনেকগুলো রিগ। রিগগুলো বসিয়ে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে। তাই প্রতিটি রিগ বাপেক্সের কাজে লাগানো দরকার। সে অনুযায়ী হিসেব করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা দরকার বাপেক্সের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here