মুরগির বিষ্ঠা থেকে জৈব সার

0
98

ঢাকা , ১৪ ফেব্রুয়ারি , (ডেইলি টাইমস২৪):

পোল্ট্রি বর্জ্যের ফলপ্রসূ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বায়োগ্যাসের বদলে জৈব সার তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে কাজী ফার্মস। বাংলাদেশে ডিম উৎপাদনের বড় খামারগুলোর সমস্যা হলো সেগুলো প্রচুর পরিমাণে দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য তৈরি করে। নির্দিষ্ট মৌসুমে কৃষকরা এসব বর্জ্য কিনে নেয়। আর বাকি পুরো বছর তা জমে স্তূপ হতে থাকে। আশেপাশের বাড়ির বাসিন্দাদের কাছ থেকে আসতে থাকে দুর্গন্ধ আর মশামাছির উপদ্রবের অভিযোগ। এই সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে ভালো উপায় বেছে নিতে গিয়ে কয়েকটি বড় খামার এসব বর্জ্যকে জৈব সারে পরিণত করছে।

দেশের শীর্ষ পোল্ট্রি উৎপাদকদের অন্যতম কাজী ফার্মস। জৈব সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং পোল্ট্রি বর্জ্যের সুব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটি পোল্ট্রি বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদনে পদক্ষেপ নিয়েছে।

কৃষিভিত্তিক দেশ বাংলাদেশ। মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ এই খাত থেকে জীবিকা আহরণ করে। এসব মানুষ সস্তা রাসায়নিক সার ব্যবহারে অভ্যস্ত। কাজী অর্গানিক ফার্টিলাইজার লিমিটেড-এর সহকারী ব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ আরেফিন বলেন, রাসায়নিক সারের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার মাটির উর্বরা শক্তি কমায়।

জমি সেচে প্রচুর অর্থ ব্যয় হওয়ার কারণে শস্যচাষীদের মধ্যে এখন জৈব সার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জৈব সারের মধ্যে থাকা জৈব উপাদান মাটিতে স্পঞ্জের মতো পানি ধরে রাখে, ফলে সেচের প্রয়োজন কমায়। খাবারে রাসায়নিকের উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত হয়ে এখন অনেকেই জৈব সারে উৎপাদিত খাবার কেনায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাজী ফার্মস পোল্ট্রি বর্জ্যকে কম্পোস্টের মাধ্যমে জৈব সারে পরিণত করার দিকে ঝুঁকছে। এই সার এরইমধ্যে কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

সরকারের নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের সব বড় পোল্ট্রি খামারকেই বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনে বায়োগ্যাস প্লান্ট বসাতে হয়। তবে সরকারের এই নীতি খুব বেশি সাফল্য আনেনি।

বাস্তবতা হচ্ছে, বেশিরভাগ পোল্ট্রি খামারের পক্ষেই বড় ধরনের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসানো সম্ভব হয় না। কারণ, এ ধরনের প্ল্যান্ট বানাতে বড় জায়গা আর বড় বিনিয়োগের দরকার পড়ে। ডিম সংগ্রহের জন্য ১০ হাজার মুরগি পালা একটি খামারে প্রতিদিন কমপক্ষে এক টন বর্জ্য তৈরি হয়। বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে এক টন বর্জ্য ব্যবহার করতে প্রথমেই এর সঙ্গে এক টন পানি ব্যবহার করতে হয়। পানি আর বর্জ্যের মিশ্রণ প্ল্যান্টে ঢোকানো হলে দুই টন তরল বর্জ্য বের হয়ে আসে।

সরকারের সার নীতিমালা বায়োগ্যাসের এই তরল বর্জ্যকে তরল সার হিসেবে বিক্রির অনুমোদন দেয় না। ফলে বিপুল পরিমাণ খরচের মাধ্যমে এই তরল বর্জ্যকে না শুকানো পর্যন্ত তা জৈব সার হিসেবে বিক্রি করতে পারে না পোল্ট্রি খামারগুলো।

অতীতে কাজী ফার্মস বহু বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসিয়েছে। এসব বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট চালু করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিপুল পরিমাণ তরল বর্জ্য উৎপাদন করেছে। নিজস্ব জমির পুকুরে এসব তরল বর্জ্য মজুত করতে গিয়ে একসময় তা ভরাট হয়ে যায়। ফলে জায়গার অভাবে একসময়ে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে তারা। আরও একটি বড় অসুবিধা হচ্ছে, বর্ষা মওসুমে এসব পুকুর উপচে আশেপাশের জমিতে তরল বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে কোনও কোনও সময় প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষতিপূরণও দিতে হয়েছে। এক সময় কাজী ফার্মস দেখতে পায় বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার সমাধান করতে পারছে না বরং এর মাধ্যমে ভোগান্তি বাড়ছে।

বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের সঙ্গে তুলনা করলে একই ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কম্পোস্ট ( জৈব সার) প্ল্যান্ট অনেক কম খরচে তৈরি করা যায়। অনেক কম জমিতে তৈরি করা যায় কম্পোস্ট প্ল্যান্ট। এতে কোনও তরল বর্জ্যও তৈরি হয় না। সেকারণে তা মজুত করতে কোনও পুকুরেরও দরকার পড়ে না।

পোল্টি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে কম্পোস্ট প্ল্যান্ট অনেক বেশি কার্যকর। কম্পোস্টে কোনও দুর্গন্ধ নেই, সহজে বিক্রি করা যায়। যথাযথ কর্তৃপক্ষ একবার কমপোস্ট পরীক্ষা করে দেখবার পরই তা প্যাকেটজাত করে ব্র্যান্ডের জৈব সার হিসেবেও বিক্রি করা যায়।

কাজী ফার্মস গ্রুপের পাঁচটি বড় ডিমের খামার রয়েছে। এসব খামারে প্রতিদিন প্রায় দশ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। প্রতিদিন এই খামারগুলোতে প্রায় ১৭০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এখন পর্যন্ত কাজী ফার্মস ছয়টি কম্পোস্ট প্ল্যান্ট পরিচালনা করছে। এসব প্ল্যান্টে প্রতিদিন ৬৫ টন জৈব সার উৎপাদিত হচ্ছে। কম্পোস্ট প্ল্যান্টের পাশাপাশি কাজী গ্রুপ তিনটি বড় বায়োগ্যাস প্ল্যান্টও চালু রেখেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির উপলব্ধি হলো বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

সরকার চায় সব পোল্ট্রি খামারই বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করুক। বাংলাদেশের যেসব বড় খামার বড় আকারের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে তারা কেবল দেখাতে চেয়েছে যে এসব প্ল্যান্ট চালানো যায় না। বড় আকারের বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে বিশাল পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হয়। আর জমির দাম ব্যয়বহুল হওয়ায় বেশিরভাগ খামারেরই তরল বর্জ্য রাখার জন্য পুকুর রাখা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশে বড় আকারের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট নির্মাণকারী প্রকৌশলীরা যথেষ্ট অভিজ্ঞ না। বড় প্ল্যান্টের তরল বর্জ্য মজুত ও তা শোধনের জন্য কতটুকু জায়গা লাগবে সে সম্পর্কে এসব প্রকৌশলীর ধারণা নেই। এক কিউবিক মিটার বায়োগ্যাস উৎপাদনে ২০ কেজি পানি ও বর্জ্যের মিশ্রণ দরকার। এ থেকে গ্যাসের পাশাপাশি তৈরি হবে ২০ কেজি তরল বর্জ্য। এর সঙ্গে খরচও জড়িত। বায়োগ্যাস প্লান্ট এবং তরল বর্জ্য শোধনে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ দুটিতেই প্রচুর খরচ পড়ে। ফলে প্রতিমাসে বিপুল পরিমাণে ব্যাংকের সুদও টানতে হয়। এছাড়া বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট এবং বর্জ শোধনাগার রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষতার দরকার। প্রয়োজন পড়ে দক্ষ শ্রমিকের। সব মিলিয়ে দেখা যায় যে পরিমাণ গ্যাস উৎপাদিত হয় তার দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হয়ে যায়।

অন্যদিকে কম্পোস্ট বা জৈব সার তৈরিতে পোল্ট্রি বর্জ্য ব্যবহার অনেক বেশি সাশ্রয়ী। কম্পোস্টিংয়ের মাধ্যমে দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্যকে গন্ধহীন পণ্যে পরিণত করা যায় যা সহজে বিক্রিও করা যায়।

কাজী অর্গানিক ফার্টিলাইজার লিমিটেড-এর সহকারী ব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ আরেফিন বলেন, সরকার যদি তরল সার বিক্রির অনুমোদন দেওয়ার কথা চিন্তা করেও থাকে তাহলেও এর মান নিশ্চিত করা কঠিন হবে। কারণ অসৎ ব্যবসায়ীরা সুয়ারেজের পানি প্যাকেটজাত করে তরল সার বলে বিক্রি করে দিতে পারবে।

গত বছর জৈব সার উৎপাদনের লাইসেন্স পাওয়ার পর কাজী ফার্মস বাণিজ্যিকভাবে জৈব সার বাজারজাত করা শুরু করে। এর ফলে মুরগির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যার সমাধান হয়েছে বলে জানান আরেফিন। তিনি বলেন, মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকার যদি কম্পোস্টিংকে উৎসাহিত করে তাহলে পোল্ট্রি খাতের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার সমাধান হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের প্রাণিসম্পদ বিষয়ক অর্থনীতিবিদ ড. একেএম আতাউর রহমান বলেন ‘বর্জ্য থেকে উৎপাদিত অ্যামোনিয়া গ্যাস মুরগি এবং আশেপাশের বাসিন্দাদের জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যগত ইস্যু বিবেচনায় নিয়ে আমরা পোল্ট্রি বর্জ্যের দ্রুত এবং আরও উন্নত ব্যবস্থাপনায় কম্পোস্ট তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছি’।

তিনি বলেন, পোল্ট্রি বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনে বর্জ্য তৈরি হয়, সেই বর্জ্যকেও আবার শোধন করতে হয়। কিন্তু কমপোস্ট উৎপাদন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার সমাধান করে।

অন্যদিকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পোল্ট্রি বর্জ্যকে কমপোস্টিং করা হলে দেশের কৃষকেরা সাশ্রয়ী দামে মানসম্পন্ন জৈব সার পাবে।

এই খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বায়োগ্যাস তৈরির চেয়ে কমপোস্ট বা জৈব সার তৈরি অনেক বেশি কার্যকর পদ্ধতি। বায়োগ্যাস তৈরিতে অনেক বেশি সময় ও সম্পদের দরকার আর সবশেষে বায়োগ্যাস উৎপাদনের পরও বর্জ্য থেকে যায়।’ তারা বলেন, সার নীতিমালা তরল সার বিক্রির অনুমোদন না দেওয়ায় বায়োগ্যাসের উৎপাদনের পর থেকে যাওয়া তরল বর্জ্য বিক্রি করা যায় না। পোল্ট্রি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কমপোস্ট উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনা করতে নীতিনির্ধারকদের আহ্বান জানান খাত সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা কী বলেন

পোল্ট্রি বর্জ্য থেকে কমপোস্ট তৈরি ভালো উদ্যোগ। এর সুবিধা দুটি। জৈব সারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এর মাধ্যমে বর্জ্যের আরও ভালো ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয়। এটা পরিবেশবান্ধব এবং খরচ সাশ্রয়ী,’ বলেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিমাল সাইন্স অ্যান্ড ভেটিরিনারি মেডিসিন এর ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, কমপোস্টের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা হলো তা মাটিকে উর্বর রাখে এবং রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া গুণাগুণ মাটিতে ফিরিয়ে আনে। অন্যদিকে এই সার শস্যকে প্রাকৃতিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ পুষ্টি সরবরাহ করে বলে জানান প্রফেসর জাহাঙ্গীর আলম।

সূত্রঃ ঢাকা ট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here