মুক্তমত

মধুর আমার মায়ের হাসি

ঢাকা , ১২ এপ্রিল , (ডেইলি টাইমস২৪):

অরলান্ডোর রাস্তায় ট্রাফিক বাড়ছে আজকাল। অফিসে যাবার আধা ঘণ্টার রাস্তা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগে যায়। ট্রাফিকে আটকে থাকা সময়টা খানিকটা সাপেবর হয় আমার জন্য। প্রতিদিন সকালে গাড়িতে করে কাজে যাওয়ার পথে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে যাই। এটি আমার অনেক দিনের অভ্যাস। আমার সুখ-দুঃখ, নিত্যদিনের বাধা বিপত্তির গল্প করি। মায়ের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব আছে। কোনো না কোনোভাবে তার সঙ্গেই কথা বেশি হয়।

যেদিন সকালে অরলান্ডোর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ে, আমি আমার মায়ের সাথে বৃষ্টি বাদলের গল্প করি। সে গল্প জুড়ে থাকে বৃষ্টিমুখর দিনে মতিঝিল এজিবি কলোনির বারান্দায় বসে আমাদের পুরোনো সেসব দিনের স্মৃতিচারণ, নড়াইলের চিত্রা নদীর বুকে বৃষ্টির মাঝে নৌ ভ্রমণের গল্প। কিংবা নানাবাড়ির বৈঠকঘরে বসে নানীর ভাঙা রেকর্ডের গান শোনার সাথে নারকেলের নাড়ু খাবার গল্প।

‘আমার মা নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন আমার বিয়ের অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষে তাকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম নায়েগ্রা জলপ্রপাতে। একটা ছোট জাহাজ করে যখন জলপ্রপাতের কাছাকাছি পৌঁছলাম আমার মা তখন চিৎকার করে তারস্বরে গান গেয়ে উঠেছিলেন।’

যেদিন সকালে অরলান্ডোর শহর জুড়ে চকচকে রোদ ওঠে সেদিন আমি আমার মায়ের সঙ্গে রোদেলা দিনে খড়রিয়ার বিলের গল্প করি। সে গল্প জুড়ে থাকে ফেদা মামার নৌকা বাইচের স্মৃতি, ফরিদ মামার সাথে শিকারে যাবার নেশার হাতছানি। আমাদের দীঘির বুকে নৌকা চালানোর স্মৃতিচারণ করেন আমার মা। এ জনমে আবার দেখা হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। দু’জনেই চুপ করে থাকি খানিক্ষণ। তখন মা জিজ্ঞেস করেন: ‘কাজে পৌঁছে গেছো বাবা?’

আমার মনে আছে আজ থেকে প্রায় সাতাশ বছর আগে যখন আফ্রিকার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাড়লাম মা আমার স্যুটকেসে দু-কেজি চালের একটা প্যাকেট দিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন বাবা তোর ভাতের কষ্ট যেন না হয় ওই জীব জন্তুর দেশে। সেসব কথা নিয়ে আজও এক গাল হাসি আমরা। জাম্বিয়ার এক প্রত্যন্ত শহর মজবুকতে ছিলাম বেশ কিছুটা সময়। তখন আমার ডাক বাংলো থেকে প্রায় প্রতিদিন রাত দুপুরে প্রশ্ন করতাম তাঁকে রান্নার রেসিপি নিয়ে। আজও করি। তাঁর রন্ধন প্রণালির নিখুঁত বর্ণনা শুনে আমি অনেক স্মৃতির সিঁড়ি বেয়ে নেমে পড়ি অনেক নিচে।

মা নিউইয়র্কে এসেছিলেন আমার বিয়ের অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষে তাকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম নায়াগ্রা জলপ্রপাতে। একটা ছোট জাহাজ করে যখন জলপ্রপাতের কাছাকাছি পৌঁছলাম আমার মা তখন চিৎকার করে তারস্বরে গান গেয়ে উঠেছিলেন। আমার মা সাধারণত গান গান না। তবে তিনি গানের একনিষ্ঠ শ্রোতা। আমার বাবা গলা ছেড়ে গান গাইতেন আমাদের মতিঝিলের বাসায়। আমার মা মুড়ি মেখে আনতেন। কিংবা ভাজা পিঠে। আমার সব প্রিয় গানের সাথে মায়ের মমতা মাখা।

আমার সারা জীবনের শখ বিশ্বমানব হবার। সে শখটি বুনে দিয়েছিলেন আমার মা। ভূগোল পড়াবার সময় খুব মজা করে সারা দুনিয়ার গল্প বলতেন তিনি। আমি মুগ্ধ হয়ে তা শুনতাম। আর তাই আমাজনের উৎস খুঁজতে ছুটে বেড়াই ইকুয়েডরের বানিওসে, তিব্বতের লাসায় খুঁজে বেড়াই ব্রহ্মপুত্রের উৎস আর কাঞ্চনজঙ্ঘায় খুঁজি হিমালয়।

আর কিছুদিন পর আমার মেয়ে আমাদের ছেড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাবে। মাঝে মধ্যে মাকে আমার উৎকণ্ঠার কথা বলি। মা আমাকে সান্ত্বনা দেন সব সময়। মনে করিয়ে দেন তার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন ছিল যেদিন আমি চিকিৎসক হলাম। আর আমার জীবনেও যেন সে দিন আসে সে প্রার্থনা তিনি করেন সব সময়। আমাকে কাছে না পাবার দুঃখকে তিনি বরণ করে নেন আমার জীবনের সব প্রাপ্তির কাছে। কঠিনেরে ভালোবেসেছেন তিনি।

আজ বললেন, ‘এ রমজান মাসে দিনে রাতে বেশি বেশি করে কোরান খতম করে তোমাদের জন্য প্রার্থনা করছি। জানি না আগামী রমজানে থাকবো কিনা।’ আমার গলা ধরে আসে এসব কথা শুনলে। আমি ওসব শুনতে চাই না।

প্রতিদিনই আমার মায়ের দিন। আমার মা আমার সাথে থাকে প্রতিদিন। মধুর আমার মায়ের হাসিতে হেসে ওঠে আমার প্রতিটি দিন।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button