মুক্তমত

ছাত্রলীগের তাঁরা পদবঞ্চিত হলেও মারবঞ্চিত হননি!

ঢাকা , ১৪ এপ্রিল , (ডেইলি টাইমস২৪):

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছর পরপর ছাত্রলীগের সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও কখনোই সময়মতো সম্মেলন হয় না। ছাত্রলীগের আগের সম্মেলনটি হয়েছিল তিন বছর আগে। সম্মেলনের মাধ্যমে আগের কমিটির নেতারা বিদায় নিলেও নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করতে আড়াই মাস লেগেছিল। গত বছরের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তারও ১০ মাস পর ঘোষণা হলো পূর্ণাঙ্গ কমিটি। আর এই কমিটি ঘোষণার পর ছাত্রলীগের গণতন্ত্রচর্চার একটি নতুন নমুনা পাওয়া গেল, যা এই বাংলাদেশ আগে ঘটেছে বলে মনে হয় না।

ছাত্রলীগ নিজেকে খুব গতিশীল ও গণতান্ত্রিক সংগঠন বলে দাবি করে। কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক সংগঠনের কমিটি গঠন নিয়ে সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যা ঘটল, তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। যেকোনো কমিটি হলে কেউ পদবঞ্চিত এবং কেউ পদপ্রাপ্ত হবেন। সাধারণত পদবঞ্চিতরা ক্ষুব্ধ হয়ে ভাঙচুর করেন, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করেন। কিন্তু এখানে ঘটেছে উল্টোটা। পদপ্রাপ্তরাই পদবঞ্চিতদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তাঁদের অপরাধ, তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করে পদবঞ্চনার কথা জানিয়েছেন। পদাধিকারীরা এটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে চেয়ার ছুড়ে মেরেছেন। মারধর করেছেন। এ ক্ষেত্রে নারী কর্মীরাও আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি। হামলার ছবি সব পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। রাতে টেলিভিশনেও দেখানো হয়েছে।

ছাত্রলীগের নতুন কমিটির নেতারা কেউ বলেননি, ছাত্রদল, শিবির বা বাম হঠকারীদের কেউ এসে এই হামলা চালিয়েছেন। অনুপ্রবেশকারীদের ওপরও দায় চাপাননি। এর অর্থ মধুর ক্যানটিনে যাঁরা মার খেয়েছেন, আর যাঁরা মেরে প্রতিপক্ষকে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন, তাঁরা উভয়ই ছাত্রলীগের।

ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির একজন নেতা বলেছেন, পুরোনো কমিটির নেতাদের অনুসারীরা কমিটি নিয়ে আপত্তি করছেন। তাঁদের সবিনয়ে জিজ্ঞেস করি, পুরোনো কমিটির নেতারা যখন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তখন বর্তমান কমিটির নেতারা কোথায় ছিলেন? পুরোনো কমিটির নেতারা এত খারাপ হলে কেন তাঁরা তাঁদের প্রতি তখন অনাস্থা প্রকাশ করেননি? তখন কথা বলার সাহস হয়নি আর এখন পদে বসে পুরোনোদের ওপর সব দায় চাপাচ্ছেন। নতুন নেতারাও যখন পুরোনো হয়ে যাবেন, কখন আবার নতুনেরা এখনকার নেতৃত্বকে ধুয়া দেবেন। এভাবেই কী বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকেরা সংগঠন চালাবেন।

ছাত্রলীগের আগের কমিটির এক নেতা বলেছেন, নতুন যে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, সেটি পকেট কমিটি। তাঁরা যোগ্যদের কমিটিতে ঠাঁই দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন। আর ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির নেতারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই কমিটি করে দিয়েছেন। সুতরাং এ নিয়ে কোনো কথা চলবে না।

দুই পক্ষই প্রধানমন্ত্রীর দোহাই দিলেও নতুন কমিটির নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করেননি। তার আগেই তাঁরা পদবঞ্চিতদের প্রতিবাদী সংবাদ সম্মেলন ডাকার জন্য উচিত শিক্ষা দিয়েছেন। পদবঞ্চিতদের অপরাধ, তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, নতুন কমিটিতে অছাত্র, বিবাহিত, মাদক ও হত্যা মামলার আসামিরাও আছেন। ছাত্রত্ব না থাকলে ছাত্রলীগ করতে পারেন না। আর বিবাহিতদের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়েও গঠনতন্ত্রে বাধা আছে। ইত্তেফাক শিরোনাম করেছে, ‘এগারো মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছাত্রলীগের: পদে আছেন অছাত্র, মাদক ব্যবসায়ী আর হত্যা মামলার আসামি’।

ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি আছেন একজন। সহসভাপতি পদে রয়েছেন মোট ৬১ জন। সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন মামুন বিন সাত্তার। সাংগঠনিক পদে আছেন ১১ জন। সিনিয়র সহসভাপতি ও যুগ্ম সচিবের পদ বিএনপিই প্রথম চালু করে এ দেশে। ছাত্রলীগ সম্ভবত সেখান থেকে ধার নিয়েছে। বিএনপি সাড়ে তিন শ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি করেছিল বলে আওয়ামী লীগ নেতারা উপহাস করেছিলেন। কেননা সাড়ে তিন শ কমিটির সদস্যের কোনো বৈঠক কোনো হলঘরে জায়গা হবে না। এখন আওয়ামী লীগ নেতারা কী বলবেন?

পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে বিতর্কিত ও অবৈধ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা। একপর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে তা শুরু করার আগেই তাঁদের ওপর হামলা চালিয়েছেন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শোভন-রাব্বানীর অনুসারীরা। আহতরা হন ছাত্রলীগের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক ও ডাকসুর সদস্য তিলোত্তমা শিকদার, গত কমিটির প্রচার সম্পাদক সাঈফ বাবু, ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক তানবীর ভূঁইয়া শাকিল, ডাকসুর সদস্য ও কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদা পারভিন, সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী শায়লা, ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক ও রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি বি এম লিপি আক্তার। এ সময় চেয়ারের আঘাতে রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী দিশার মাথা ফেটে যায়। আহত লোকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হাসপাতালে তাঁদের দেখতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি স্লোগান হয়। ছাত্রলীগের এই বিরোধ সত্তর ও আশির দশকের কথা মনে করিয়ে দেয়। সত্তর দশকে বিরোধের কারণে মুহসীন হলে ছাত্রলীগের সাত কর্মীকে হত্যা করা হয়, যাঁর নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান। আর আশির দশকের বিরোধের জের ধরে ছাত্রলীগ কাদের-চুন্নু নামে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।

ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের কমিটির বিরোধ কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সেই জবাব ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে। তবে ছাত্রলীগের আক্রান্ত কর্মীরা এই ভেবে স্বস্তি পেতে পারেন যে তাঁরা পদবঞ্চিত হলেও মারবঞ্চিত হননি। ছাত্রলীগের হাটে গেলে সবাই কিছু না কিছু পান। কেউ পদ পান, কেউ মার খান।

সোহরাব হাসান: যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button