জাতীয়প্রধান সংবাদমুক্তমত

শের-ই-বাংলার ৫৮তম মৃত্যুবাষির্কী আজ

ঢাকা , ২৭ এপ্রিল, (ডেইলি টাইমস২৪): শের-ই-বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক একটি অবিস্মরণীয় নাম, এক অসাধারণ ব্যক্তি। মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে শেরে বাংলা আমাদের কাছে চিরস্মরণীয়। জাতি হিসেবে আমরা যে সবাই বাঙালি-এই ঐতিহাসিক সত্যের মূল ভিত্তি তিনিই রচনা করেছেন। এই মহান জাতীয় নেতার মৃত্যুবার্ষিকী আজ I ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।

একজন বাঙালি রাজনীতিবিদ হিসেবে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কূটনীতিক ও রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের কাছে তিনি বাংলার বাঘ এবং হক সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও তিনি কলকাতার মেয়র, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, গভর্নর এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। জাতি আজ তাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।

অবিভক্ত বাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের জন্মস্থান সাতুরিয়ার মিঞা বাড়িটি আমাদের ইতিহাসের অংশ। কিন্তু এই ইতিহাসকে রক্ষা করতে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে সেখানে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রকৌশলী এ কে এম রেজাউল করিম ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই প্রতিষ্ঠানটি করেছেন। অন্য দিকে ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের শের-ই-বাংলার সেই বাল্য স্মৃতি বিজরিত নানা বাড়ি মিঞা বাড়িটি এখনও রয়েছে সম্পূর্ণ অরতি ও পরিত্যক্ত অবস্থায়। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধীনে থাকা এই বাড়িটির রণাবেণে প্রতœতত্ব বিভাগ উদাসিনতার পরিচয় দিয়েই চলছে।
এদিকে শের-ই-বাংলার স্মৃতি সংরণসহ তার জীবনীর উপর গবেষণা ও অধ্যয়ন করার জন্য মিঞা বাড়ির খুব কাছেই সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে নিজস্ব জমিতে নির্মিত হয়েছে ‘শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’।

এই ইনস্টিটিউট’র নিজস্ব দ্বিতল ভবন রয়েছে। ভবনের নিচতলায় রয়েছে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। এর প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রকৌশলী এ কে এম রেজাউল করিম সাতুরিয়া গ্রামেরই সন্তান। ধারণা করা হচ্ছে শের-ই-বাংলাকে নিয়ে কাজ করার জন্য বেসরকারিভাবে এটাই দেশের সর্বপ্রথম বড় উদ্যোগ।

২৭ এপ্রিল ২০২০ শের-ই-বাংলার ৫৮তম মৃত্যুবাষির্কী উপলক্ষে সাতুরিয়ায় ব্যাপক কর্মসূচী পালন করবে ‘শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনন্সিটিটিউট’। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে কোরআন খানি, দোয়া, শিক্ষার্থীদের মধ্যে টি শার্ট এবং বই বিতরণ।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন উপমহাদেশের এক অসাধারণ প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক নেতা। প্রায় অর্ধ-শতাব্দীর অধিককাল তিনি গণমানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন।

শেরে বাংলা বাঙালি রাজনীতিবিদ। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙালি কূটনীতিক হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন। রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের নিকট শেরে বাংলা এবং `হক সাহেব` নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক অনেক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার মধ্যে কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭ – ১৯৪৩), পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী (১৯৫৫), পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬ – ১৯৫৮) অন্যতম।

বাঙালি জাতির গৌরব উজ্জ্বল নক্ষত্র শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। তার মহতি কর্ম ও অবদানের কারণে, তিনি বাংলার কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন। শিক্ষার প্রকৃত আলো জ্বেলে ও প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে ফুটিয়ে ছিলেন উজ্জ্বল হাসি। বিশেষ করে বাংলার মুসলমান যখন অশিক্ষা, দারিদ্র ও হতাশায় ভুগছে তখন তিনিই নিরলস প্রয়াস চালিয়ে এই অধঃপতিত জাতিকে উদ্ধার করেন। তার কর্মময় জীবনে তিনি শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

১৯৪০ সালে শেরে বাংলার প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছরে তার প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুন্সিগঞ্জে প্রতিষ্ঠা হয় হরগঙ্গা কলেজ। তার নিজ গ্রামে ও একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি এখানে মাদ্রাসা ও হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তপসিলী সম্প্রদায়ের শিক্ষার জন্য তিনি প্রথম বাজেটে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেন। ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে কলকাতায় লেডি ব্রার্বোন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি মুসলমানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেন। শিক্ষা বিস্তারে শেরে বাংলার ভূমিকা ছিল অনন্য। বাঙালি মুসলমানদের মাঝে শিক্ষা বিস্তারে ছিল তার অসামান্য অবদান। শিক্ষা প্রসারের জন্য তার অবদান বাঙালি জাতি চিরদিন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

শেরে বাংলার জন্ম ১৮৭৩ সালের ২৯ অক্টোবর ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজিলার অন্তর্গত সাতুরিয়া মিয়া বাড়িতে, তার মাতুলালয়ে জন্ম গ্রহন করেন।

তার পিতা ওয়াজেদ আলী ছিলেন বরিশালের খ্যাতনামা আইনজীবী। বিপুল ঐশ্বর্যশালী পিতার একমাত্র সন্তান হলেও ফজলুল হক বাল্যকাল থেকেই বহু সদগুণের অধিকারী ছিলেন। বাল্যকাল থেকেই তেজস্বিতা, তীক্ষè মেধা ও প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়।

১৮৯৭ সালে তিনি বি. এল. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপরই তিনি পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা আইনজীবী স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহকারী রূপে ১৯০০ সালে কলকাতা হাই কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯০৬ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি গ্রহণ করেন। কিন্তু তেজস্বী হক সাহেব সরকারের সাথে মতবিরোধ হওয়ায় ১৯১১ সালে চাকরি ছেড়ে আবার আইন ব্যবসায়ে নেমে পড়েন।

১৯১৮ সালে ভারত মুসলিম লীগের দিল্লী অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে তার দেওয়া ভাষণ ইতিহাসের এক স্বর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। ১৯২৫ সালে তিনি বাংলার মন্ত্রী সভার সদস্য মনোনীত হন।১৯২৭ সালে তিনি কৃষক-প্রজা পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৩০-৩১ এবং ১৯৩১-৩২ সালে তিনি বিলেতে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। সেখানে তার ব্যক্তিত্বপূর্ণ বক্তৃতা সবার মনে সাড়া জাগায়। ১৯৩৫-৩৬ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন এ পদে অধিষ্ঠিত প্রথম বাঙালি মুসলমান।১৯৩৭ সালে তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন।

১৯৪০ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে জ্বালাময়ী বক্তৃতায় প্রথম পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন। তার বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে পাঞ্জাববাসীরা তাকে উপাধি দেয় শের-ই-বঙ্গাল অর্থাৎ বাংলার বাঘ। সে থেকে তিনি শেরে বাংলা নামেই পরিচিত।

১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘকালের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে তিনি বহু জনকল্যাণমূলক কাজ করেন। এ সময়ে তিনি ‘ঋণ সালিশী বোর্ড’ গঠন করেন। এর ফলে দরিদ্র চাষীরা সুদখোর মহাজনের কবল থেকে রক্ষা পায়।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি ১৯৫২ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের এডভোকেট জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৯৫৪ সালে দেশের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ‘যুক্তফ্রন্ট’ দলের নেতৃত্ব দিয়ে বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টর-অব-ল এবং ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাঁকে ‘হিলাল-ই-পাকিস্তান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার সাধনা ছিল তার আজীবনের। তারই প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ, লেডী ব্রাবোর্ণ কলেজ, তার স্বগ্রাম চাখারে ফজলুল হক কলেজ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

উনিশ শতকের শেষ ভাগে হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতৃত্বে ছিলেন অধিকাংশ হিন্দু নেতা। তাঁদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির ফলে মুসলমান সম্প্রদায় ভৌগোলিক ও ভাষাগত জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ধর্মকেই জাতীয়তাবাদের মূল সূত্র হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান স্বদেশ চেতনা মুসলমানদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। এমন কি মাতৃভাষার প্রতি তারা উদাসীন ছিল। সুচতুর ইংরেজরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ সৃষ্টি সহায়তা করে। মুসলিম নেতারা ধর্মভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মূলধন করেছিল। তাদের পশ্চাত্মুখী নেতৃত্বের জন্য বিশ শতকের দু’দশক পর্যন্ত ‘মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ না ঘটায়, ভৌগোলিক জাতীয়তাবোধ তাদের মধ্যে দেখা দেয়নি। রাজনৈতিকভাবে বাঙালি মুসলমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ফজলুল হকের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।

জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি জনগণের মধ্যে চেতনাবোধ। তাদের মধ্যে যদি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ব্যাপক চেতনা সৃষ্টি না হয়, তাহলে জাতীয়তাবাদের সূচনা সম্ভব নয়। এ কে ফজলুল হকের ধারণা ছিল শিক্ষার মাধ্যমে অনগ্রসর মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করা সম্ভব। শিক্ষা বিস্তার সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করে জাতীয়তার শক্ত ভিত তৈরি করে। তিনি শক্তিশালী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী সৃষ্টি করে মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতাবোধ, বঞ্চনাবোধ ও রাষ্ট্রীয় কাজের অংশগ্রহণের অভাববোধকে দূর করে খাঁটি জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।১৯১৩ সালে এ কে ফজলুল হক রাজনীতি অঙ্গনে প্রবেশ করে মুসলিম সমাজে শিক্ষা বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। মুসলমানদের শিক্ষাগত পশ্চাত্পদতা তাঁকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। তাই তিনি বঙ্গীয় আইনসভায় মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের বিষয়ে বার বার বক্তৃতা দিয়েছেন। সরকার বাধ্য হয়ে মুসলমানদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি মুসলমানদের চাকরির সুবিধা করে দেন। ফলে বিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের বিকাশ ঘটতে থাকে বাংলায়। মুসলিম সমাজের সেবার পাশাপাশি তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। তিনি ১৯১৬ সালে লখেনৗ চুক্তির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। এ সময় তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী এবং স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের নেতা। ১৯১৮ সালে দিল্লিতে মুসলিম লীগ সম্মেলনে তিনি যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তা তাঁকে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা আসনে অধিষ্ঠিত করে। ১৯২০ সালে তিনি মেদিনীপুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। সম্মেলনে তাঁর ভাষণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তা শেষত স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে।জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ ও মহাজনী শোষণ বন্ধ করার জন্য ফজলুল হক প্রজা আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর কৃষক-প্রজা সমিতির কর্মসূচি রাজনীতিকে দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি সংগ্রামের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পটভূমি তৈরি করতে সাহায্য করে। মুসলমান জমিদার-জোতদার আর হিন্দু জমিদার-মহাজনদের মুসলিম প্রজাদের শোষণের ব্যাপারে কোনো পার্থক্য ছিল না। এদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য একটি নতুন শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ তৈরি হচ্ছিল। তারা ছিল গ্রাম-বাংলার কৃষকের সন্তান, তারা কৃষক সমাজের নেতৃত্ব দেবে এটাই স্বাভাবিক। পল্লী-বাংলার ব্যাপক জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে ফজলুল হক যেমন নিজের অবস্থান ও রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করেছে, তেমনি নবাব-নাইট অধ্যুষিত মুসলিম লীগ নেতৃত্বের স্বরূপও তুলে ধরেছেন। মুসলিম লীগ নেতৃত্ব কৃষকের সমস্যার কথা বললেও শুধু সাম্প্রদায়িক ফায়দা লোটার স্বার্থে কৃষকদের ব্যবহার করা ছাড়া তেমন কিছুই করেনি, করা তাদের পক্ষে সম্ভবও ছিল না। কংগ্রেস বোধগম্য কারণেই কৃষকের মৌল সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেনি। ফজলুল হকের ভূমিকা এখানে মুসলিম লীগ বা কংগ্রেসের চাইতে ভিন্ন। শুধু ভোট পাওয়ার জন্য ধর্মের নামে তিনি মুসলিম কৃষকদের ব্যবহার করতে চাননি। তিনি কৃষকদের জন্য ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তিনি তাঁর মোকাবেলার জন্য রাজনীতি নির্ধারণ করেছিলেন। ফজলুল হকের আগে আর কোনো রাজনীতিবিদই বাংলাদেশের ব্যাপকসংখ্যক কৃষককে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে টেনে আনতে পারেননি। তিনি বাংলার রাজনীতিকে ঢাকার আহসান মঞ্জিল ও কলকাতা শহরের চৌহদ্দি থেকে রাজপথে, গ্রাম-বাংলার মাঠে-ঘাটে নিয়ে আসেন। এভাবে তিনি কৃষকদের মধ্যে সামাজিক বিপ্লবের প্রক্রিয়া চালু করতে পেরেছিলেন। ফজলুল হকের এটা মৌলিক অবদান। জাতীয়তাবাদের বিকাশে এ ঘটনার বিশেষ গুরুত্ব আছে। জাতীয়তাবাদের জন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য প্রয়োজন। ফজলুল হকের চেষ্টায় তা প্রথমবারের মতো অর্জিত হয়েছিল। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের অসম বিকাশের সুযোগ নিয়ে সাম্প্রদায়িক দলগুলো তখন পরস্পরের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে তত্পর। কৃষি ও শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে শেরে বাংলা হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে চেষ্টা করেন। তিনি তাঁর কর্মসূচির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বাঙালি জাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বিরোধিতার জন্য তিনি এ সংগ্রাম পূর্ণ সফলতা লাভ না করলেও জাতি গঠনের সকল উপাদান সৃষ্টি করে যেতে সক্ষম হন। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতি গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, ফজলুল হক জাতি গঠনের প্রারম্ভিক কাজটুকু শেষ করে যেতে পেরেছিলেন বলেই।১৯৩৭ সালে নির্বাচনে বিজয় লাভের পর ফজলুল হক কংগ্রেসের সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অসহযোগিতার জন্য এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তাঁকে বাধ্য হয়ে মুসলিম লীগের সঙ্গে সরকার গঠন করতে হয়। এ সময় তাঁকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পর্যন্ত করতে হয়েছিল। ১৯৩৭-৪১ সালে মুসলিম লীগের অসহযোগিতার জন্য অনেক গণমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়িত করতে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন ফজলুল হক। তিনি কোনোদিন সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। ১৯৪১-৪৩ সালে মন্ত্রিসভা আমলে তিনি একজন জাতীয় নেতার ভূমিকা পালন করেছেন। এজন্য মুসলিম লীগ তাঁকে কংগ্রেসের দালাল, মুসলমানদের শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছে। ফজলুল হক ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক এবং হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রতীক। তাই স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেছেন, ফজলুল হক মাথার চুল হতে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি, সেই সঙ্গে তিনি খাঁটি মুসলমান। খাঁটি বাঙালিত্ব ও খাঁটি মুসলমানত্বের সমন্বয়েই গঠিত হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাঙালি জাতির ভবিষ্যত্ নির্ভর করে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের ওপর এবং ফজলুল হক সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটিকে তাঁর গভীরে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁকে বলতে দেখেছি যে হিন্দু জমিদার, মহাজন ও মুসলমান জমিদার, মহাজন সমভাবে কৃষক-প্রজাদের ওপর নিপীড়ন চালায়। তাঁর চিন্তাধারায় সাম্প্রদায়িকতা নেই। আছে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও প্রগতিশীল চিন্তার পরিচয় । তিনি এ সমস্যাকে জানতেন এবং সকল সম্প্রদায়ের ঐক্যের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচনা করতে চেয়েছিলেন। সেদিনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্রোতে তিনি পূর্ণ সাফল্য অর্জন করেননি সত্য, তবু তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল স্রোতোধারা ধরে রেখেছেন এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয় লাভের মাধ্যমে তাকে বিজয়ের পথে নিয়ে যাবার প্রয়াস চালান। সে বিজয়ের পথ ধরে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন করতে সফলতা অর্জন করেন। তাঁর এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনে ছিল শেরে বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অবদান। বস্তুত আজকের বাংলাদেশ ফজলুল হকের সৃষ্ট জাতীয়তাবাদেরই ফসল।

ব্যক্তিগত দানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন হাতেম তাই। তার গোপন দানে কত দুঃস্থ কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে, কত ছাত্র পরীক্ষার ফি দিয়ে নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দিয়েছে, তার দানে যে কত সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কত পীড়িতের দুঃখমোচন হয়েছে তার হিসেব নেই।

বাংলার নয়নমণি শের-এ-বাংলা এ. কে ফজলুল হক ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল প্রায় ৮৯ বছর বয়সে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। এ প্রবীণ জনদরদী নেতার মৃত্যু সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে সারা বাংলায় নেমে আসে শোকের ছায়া, শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়ে সমগ্র দেশবাসী। ঢাকার পুরানো হাইকোর্টের পাশে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়।

বাঙালি সমাজ যত দিন বেঁচে থাকবে, ততদিন তাদের হৃদয়ে ফজলুল হক চিরজীবী। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতি বুঝিনে। ওসব দিয়ে আমি ফজলুল হককে বিচার করিনে। আমি তাকে বিচার করি গোঁটা দেশ ও জাতির স্বার্থ দিয়ে। একমাত্র ফজলুল হকই বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে বাঁচাতে পারে। সে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সাচ্চা মুসলমান। খাঁটি বাঙালিত্ব ও সাচ্চা মুসলমানিত্বের এমন সমন্বয় আমি আর দেখিনি।’

ইতিহাস কখনো ভুলে যাওয়ার নয় 🌿

কলকাতার বাবুরা বলেছেন,”ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই। ফার্মগেট আছে,ধানমণ্ডি আছে পাশে একটা কৃষি কলেজ করে দাও। “

এই ধরনের কায়েমী স্বার্থবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ লর্ডের কাছে গিয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক বোঝালেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। এবার ব্রিটিশরা কিছুটা নমনীয় হল — কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হল একটু দেরীতে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক ।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯১৬ সালে মুসলিম লীগ এর সভাপতি নির্বাচিত হন । পরের বছর ১৯১৭ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সাধারণ সম্পাদক হন । তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি একই সময়ে মুসলিম লীগ এর প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন । ১৯১৮ -১৯ সালে জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব ।

১৯৩৭ এর নির্বাচনে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচনে জিতলে তিনি জমিদারি প্রথা চিরতরে উচ্ছেদ করবেন।
তিনি যাতে নির্বাচিত হতে না পারেন তার জন্য সারা বাংলাদেশ আর কলকাতার জমিদাররা একত্র হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন। লাভ হয়নি — কৃষকরা তাদের নেতাকে ভোট দিয়েছেন।

মুসলিম লীগ এর লাহোর অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বক্তব্য দিচ্ছেন । হঠাৎ করে একটা গুঞ্জন শুরু হলো, দেখা গেল জিন্নাহর বক্তব্যের দিকে কারও মনযোগ নাই । জিন্নাহ ভাবলেন, ঘটনা কী ? এবার দেখলেন, এক কোণার দরজা দিয়ে ফজলুল হক সভামঞ্চে প্রবেশ করছেন, সবার আকর্ষণ এখন তার দিকে । জিন্নাহ তখন বললেন — When the tiger arrives, the lamb must give away. এই সম্মেলনেই তিনি উত্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব ।

১৯৪০ সালের ২২-২৪ শে মার্চ লাহোরের ইকবাল পার্কে মুসলিম লীগের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি তার প্রস্তাবে বলেন, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বাস্তবতায় হিন্দু মুসলিম একসাথে বসবাস অসম্ভব। সমাধান হচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র এবং পূর্বাঞ্চলে বাংলা ও আসাম নিয়ে আরেকটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

পাঞ্জাবের মওলানা জাফর আলী খান, সীমান্ত প্রদেশের সর্দার আওরঙ্গজেব, সিন্ধের স্যার আব্দুল্লাহ হারুন, বেলুচিস্তানের কাজী ঈসা ফজলুল হকের প্রস্তাব সমর্থন করেন। কনফারেন্সে এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়।

লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের সময়ে হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলোতে মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকার কারণে ফজলুল হক খুবই উদ্বিগ্ন এবং কিছুটা উত্তেজিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে একবার বলেন, ‘ আমি আগে মুসলিম, পরে বাঙালী (muslim first, bengali afterwards)’। বক্তৃতার এক পর্যায়ে এসে বলেন, ‘কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলোতে যদি আর কোনো মুসলিম নির্যাতিত হয় তাহলে আমি বাংলার হিন্দুদের উপর তার প্রতিশোধ নেব।’

যে ফজলুল হক তিন বছর আগে সোহরাওয়ার্দী, নাজিমউদ্দিনকে রেখে শ্যামাপ্রসাদের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছেন সেই ফজলুল হকের মুখে এমন বক্তব্য তখনকার ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃাষ্ট করেছিল।

বর্তমানে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার ভিত্তি হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব। তাই ২৩ শে মার্চ কে পাকিস্তানে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

কিন্তু লাহোর প্রস্তাব পাশ হওয়ার কয়েকদিন পরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চালাকির আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি টাইপ করার সময়ে ভুল করে muslim majority states লেখা হয়েছে; আসলে হবে state । জিন্নাহর ধারণা ছিল, দেন-দরবার করে দুই পাশে দুইটা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই স্টেটস এর জায়গায় স্টেট লিখে একটা মুসলিম মেজরিটি রাষ্ট্র করতে হবে।

জিন্নাহর এই ধূর্ততার কারণে ফজলুল হক তার সাথে পাকিস্তান আন্দোলনে সম্পৃক্ত হননি। তরুণ শেখ মুজিব যখন জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তখন অভিজ্ঞ ফজলুল হক পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। ‘তিঁনি অনুমান করতে পেরেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে কী কী দুর্দশা হবে বাংলার মানুষের। তাই তিঁনি পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন…….

বাংলার মাটিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চাননা এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়েই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন- দাঁড়িয়ে বললেন,”যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব।” এ কথার পর আমি অন্যভাবে বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম। সোজাসুজিভাবে আর হক সাহেবকে দোষ দিতে চেষ্টা করলাম না। কেন পাকিস্তান আমাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে তাই বুঝালাম। শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, মার খেয়ে।”

বঙ্গবন্ধু ‘ র বাবা বলেছেন , ” বাবা তুমি যাই করো শেরে বাংলার বিরুদ্ধে কিছু বলো না। শেরে বাংলা এমনি এমনি শেরে বাংলা হয়নি। “

ফজলুল হক জানতেন মাঝখানে ভারতকে রেখে পশ্চিম আর পূর্বে জোড়া দিয়ে এক পাকিস্তান করলে তা কখনো টিকবে না। ‘ জিন্নাহ আমার লাহোর প্রস্তাবের খৎনা করে ফেলেছে -বলে ফজলুল হক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকেননি।

১৯৪৬ এ এসে জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীর দুই বাংলা একত্র করে স্বাধীন যুক্তবাংলার দাবী মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাও ভাগ করতে হল।

ফজলুল হক বলেছিলেন, একটি পাকিস্তান কখনও টিকবে না। বাংলা এবং আসামকে নিয়ে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র করতে হবে।

১৯৭১ সালে এসে দেখা গেল, ফজলুল হকের আশঙ্কা এবং ভবিষ্যতবাণী সঠিক। ১৯৭১ এর মত এমন কিছু যে ঘটবে শেরে বাংলা ফজলুল হক তা আঁচ করতে পেরেছিলেন ১৯৪০ সালেই। তাই তিনি ১৯৪০ সালেই বাংলা আর আসাম নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।

১৯৭১ এর যুদ্ধ হল ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। লাহোর প্রস্তাব ফজলুল হক যেভাবে উত্থাপন করে ছিলেন সেভাবে মানলে একাত্তরে এই দেশে রক্তগঙ্গা বইত না।

পেশাজীবনে ‘কলকাতা হাইকোর্টের নামকরা আইনজীবী ছিলেন। একদিন তাঁর জুনিয়র হাতে একগাদা পত্রিকা নিয়ে এসে বললেন, ” স্যার , দেখুন , কলকাতার পত্রিকাগুলো পাতার পর পাতা লিখে আপনার দুর্নাম ছড়িয়ে যাচ্ছে — আপনি কিছু বলছেন না । ” তিঁনি বললেন, ” ওরা আমার বিরুদ্ধে লিখছে তার মানে হল আমি আসলেই পুর্ব বাংলার মুসলমান কৃষকদের জন্য কিছু করছি। যেদিন ওরা আমার প্রশংসা করবে সেদিন মনে করবে বাংলার কৃষক বিপদে আছে। “

মুহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বরিশাল বারের নামকরা উকিল । একবার ওয়াজেদ আলী র প্রতিপক্ষ মামলার ইস্যু জটিল হওয়ার কারণে কলকাতা থেকে তরুণ উকিল ফজলুল হককে নিয়ে আসে ওয়াজেদ আলীকে মোকাবেলা করার জন্য । ফজলুল হক ওই সময়ে কেবলমাত্র ফজলুল হক , শেরে বাংলা তখনও হননি । তিনি মামলা লড়তে এসেছেন , কিন্তু বিপক্ষের উকিল কে সেই খবর জানতেন না ।

কোর্টে এসে দেখলেন বিপক্ষে তার বাবা ওয়াজেদ আলী দাঁড়িয়েছেন । ফজলুল হক স্বাভাবিকভাবে যুক্তিতর্ক শুরু করলেন ।

এক পর্যায়ে ওয়াজেদ আলী আদালতকে উদ্দেশ করে বললেন , “ ইনি যা বলছেন তা আইনসংগত না । আইনটা হল আসলে এরকম এরকম ……. ইনি নতুন উকিল তো আইন কানুন ভালো বোঝেন না । “

উত্তরে ফজলুল হক বললেন , “ তিনি পুরাতন অভিজ্ঞ উকিল হলে কী হবে ? তিনি হচ্ছেন কৃষকের ছেলে উকিল ( প্রকৃতপক্ষে তার দাদা আকরাম আলী ছিলেন ফারসি ভাষার পন্ডিত ) , তিনি আইনের কী আর বোঝেন ? আমি হচ্ছি উকিলের ছেলে উকিল , যুক্তি আমারটাই ঠিক । “

খ্যাতির সাথে ৪০ বছর ধরে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করেছেন । আইন পাশ করার আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্স কেমেস্ট্রি আর ম্যাথমেটিক্সে ট্রিপল অনার্স করেছেন । মাস্টার্স করেছেন ম্যাথমেটিক্স এ । ছোটবেলায় একবার পড়ে বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলার গল্প রূপকথার মত এদেশের সবার মুখে মুখে ।

বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশনে একজন এম পি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বক্তব্য দিতে লাগলেন । ঐ এম পি শেরে বাংলার বিরুদ্ধে গানও লিখে এনেছেন এবং সংসদের বাজেট বক্তুতা করতে গিয়ে সেই গানটি হেলেদুলে কর্কশ কণ্ঠে গাইতে শুরু করলেন । এরকম পরিস্থিতিতে যে কারও পক্ষে মাথা ঠাণ্ডা রাখা মুশকিল ।

শেরে বাংলা ঐ এমপি র বক্তব্যের মধ্যেই বলে উঠলেন — “Mr Speaker, I can jolly well face the music, but I cannot face a monkey.”

এবার ঘটলো মারাত্মক বিপত্তি । তার মত নেতার কাছ থেকে এরকম মন্তব্য কেউ আশা করেনি । এদিকে , ঐ এম পি স্পিকারের কাছে দাবী জানালেন — এই মুহূর্তে ক্ষমা চাইতে হবে এবং এই অসংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে । স্পিকার পড়লেন আরেক বিপদে — তিনি কীভাবে এত বড় একজন নেতাকে এই আদেশ দেবেন ।

শেরে বাংলা ছিলেন ঠাণ্ডা মাথার বুদ্ধিমান মানুষ । তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন — ” Mr. Speaker, I never mentioned any honourable member of this House. But if any honourable member thinks that the cap fits him, I withdraw my remark.”

‘জ্ঞানতাপস প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক তাঁর জীবনী লিখতে চান জেনে বলেছিলেন, ” রাজ্জাক, সত্যি বলো, তোমার মতলবটা আসলে কী ? ” প্রফেসর রাজ্জাক বললেন, ” আমার এই বিষয়টা খুব ভালো লাগে —- আপনি যখন ইংরেজদের সাথে চলেন তখন মনে হয় আপনি জাত ইংরেজ। যখন বরিশালে আসেন মনে হয় আপনি বহুবছর ধরে নিজেই কৃষিকাজ করেন। আবার যখন কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদ বাবুকে ভাই বলে ডাক দেন তখন আপনাকে আসলেই হিন্দু মনে হয়। আবার যখন ঢাকার নবাব বাড়িতে ঘুড়ি উড়ান তখন মনে হয় আপনিও নবাব পরিবারের একজন । নিজেকে কেউ আপনার মত এত পাল্টাতে পারে না। আপনি যাই বলেন, সত্য হোক — মিথ্যা হোক, মানুষ বিনা দ্বিধায় তা বিশ্বাস করে। “

মহাত্মা গান্ধী র নাতি রাজমোহন গান্ধী তার বইতে লিখেছেন — তিন নেতার মাজারে তিনজন নেতা শায়িত আছেন যার মধ্যে দুজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন । একজনকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া হয়নি, অথচ তিনিই ছিলেন সত্যিকারের বাঘ ।

কিন্তু এটা তার জীবনের কোনো অপূর্ণতা নয়, একমাত্র রাষ্ট্রপতি হওয়া ছাড়া সম্ভাব্য সব ধরনের পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে । তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব বাংলার তৃতীয় মুখ্য মন্ত্রী; পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পূর্ব – পাকিস্তানের গভর্নর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ।

সর্বভারতীয় রাজনীতি ছেড়ে শুধু পূর্ববাংলার রাজনীতি কেন করছেন এই প্রশ্নের উত্তরে ফজলুল হক বলেছিলেন — এরোপ্লেন এ উঠলে নিচের জিনিস ছোট আর ঝাপসা দেখাতে পারে, তাই আমি মাটিতেই থাকছি । রাজনীতির এরাপ্লেন এ না চড়লেও সৌদি বাদশাহ সউদ ফজলুল হকের সাথে একটা মিটিং করার জন্য নিজের ব্যক্তিগত বিমান পাঠিয়েছিলেন ফজলুল হককে নিয়ে যাওয়ার জন্য ।

অসীম সাহসী এই মানুষটি আমাদেরকে সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রতিবাদ করার কথা বলেছেন। বাঙালী জাতিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন অনেক আগেই । তিনি বলেছেন, যে জাতি তার বাচ্চাদের বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়, তারা সিংহের সাথে লড়াই করা কিভাবে শিখবে ?

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন ফজলুল হকের শিক্ষক। আবুল মনসুর আহমদের সাথে আলাপচারিতায় ফজলুল হক সম্পর্কে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মন্তব্য :

“ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙ্গালী।সেই সঙ্গে ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান।খাঁটি বাঙ্গালীত্বের সাথে খাটি মুসলমানত্বের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। ফযলুল হক আমার ছাত্র বলে বলছিনা, সত্য বলেই বলছি।খাঁটি বাঙ্গালীত্ব ও খাটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙ্গালীর জাতীয়তা।”

রেফারেন্স: আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর।(পৃষ্ঠা ১৩৫-৩৬)

পহেলা বৈশাখের সরকারি ছুটি, বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা এই ফজলুল হকের অবদান । কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ফজলুল হক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন কারণ কৃষক–শ্রমিক সংখ্যাগরিষ্ঠ এই উপমহাদেশে মাত্র একজন ব্যক্তি কৃষকদের জন্য রাজনীতি করেছেন । তিঁনি হলেন — শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ।

১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসেছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বললে ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ করে। জিন্নাহ ছাত্রদের সাথে বৈঠকও করেন। কিন্তু ছাত্ররা ছিল নাছোড়বান্দা। জিন্নাহর ধারণা হলো, ফজলুল হক ছাত্রদেরকে উসকানি দিচ্ছেন। ফজলুল হকের বুদ্ধিতে ছাত্ররা উর্দুর বিরোধিতা করছে। জিন্নাহ এবার ফজলুল হকের সাথে দেখা করতে চাইলেন। কিন্তু ফজলুল হক দেখা করতে রাজি হলেন না। ফজলুল হক জিন্নাহকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করতেন।

জিন্নাহর পীড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন ফজলুল হক। বন্ধ দরজার আড়ালে কথা হয়েছিল দুই মহান নেতার। কিন্তু ইংরেজিতে কী ধরনের বাক্য বিনিময় হয়েছিল তাদের মধ্যে পরবর্তীতে তা লিখেছেন ফজলুল হকের একান্ত সহকারী আজিজুল হক শাহজাহান —

জিন্নাহ : পাকিস্তান তো তুমি কোনোদিন চাওনি। সব সময়ে বিরোধিতা করে এসেছো।

হক : প্রস্তাবটি তো আমিই করেছিলাম। পরে ওটার খতনা করা হয়েছে। আমি এটা চাইনি।

জিন্নাহ: পাকিস্তানের এই অংশ বেঁচে থাক তা তুমি চাও না। তাই ভারতের কংগ্রেসের টাকা এনে ছাত্রদের মাথা খারাপ করে দিয়েছ। তারা আমাকে হেস্তনেস্ত করছে।

হক: আমি এখানে কোনো রাজনীতি করি না। হাইকোর্টে শুধু মামলা নিয়ে চিন্তা করি। আইন আদালত নিয়ে থাকি ।

জিন্নাহ : জানো, তুমি কার সাথে কথা বলছো ?

হক: আমি আমার এক পুরোনো বন্ধুর সাথে কথা বলছি।

জিন্নাহ: নো নো, ইউ আর টকিং উইথ দ্য গভর্নর জেনারেল অব পাকিস্তান ।

হক: একজন কনস্টিটিউশনাল গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা আমি জানি।

জিন্নাহ: জানো, তোমাকে আমি কী করতে পারি ?

হক: (ডান হাতের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে) তুমি আমার এ্যাই করতে পারো। মিস্টার জিন্নাহ, ভুলে যাওয়া উচিত নয় এটা বাংলাদেশ এবং তুমি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সাথে কথা বলছ।

(আজিজুল হক শাহজাহানের কলাম,অমরাবতী প্রকাশনী,ঢাকা;পৃষ্ঠা ৪৬-৪৭)

শের-ই-বাংলার জন্মস্থান ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে এ মহান নেতার স্মৃতিকে স্মরনীয় রাখার জন্য যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিশিষ্ট সমাজসেবক ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর (শের-ই-বাংলার জন্মদিন) সাতুরিয়া গ্রামে শের-ই-বাংলার নানা বাড়ীর কাছে ‘শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনন্সিটিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণ বাংলার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মো: হানিফ এ প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব জমিতে দ্বিতল ভবন রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর হতেই ‘শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনন্সিটিটিউট’ ব্যাপক আয়োজনে প্রতি বছর শের-ই-বাংলার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে আসছে।

শের-ই-বাংলার স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকৌশলী এ কে এম রেজাউল করিম বলেন, শের-ই- বাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো নেতার জন্ম আমাদের সাতুরিয়া গ্রামে হওয়ায় আমরা গর্বিত। কিন্তু এই মহান নেতার স্মৃতি রক্ষIয় এই গ্রামে কোনো সরকারি বা অন্য কোনো উদ্যোগ ছিল না। তাই আমি গত বছর ‘শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করি। এই প্রতিষ্ঠানটিকে আমি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে জাতির গর্বের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত করাতে চাই।

সমাজ সেবক ও দানবীর মরহুম আলহাজ্ব কে.এম আবদুল করিম (রাহিমাহুল্লাহ) শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হক রির্চাস ইনস্টিটিউট এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি I

ঢাকা , ২৭ এপ্রিল, (ডেইলি টাইমস২৪)/আর এ কে

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button
Close