ধর্ম ও জীবন

রমজানে পারস্পরিক সহমর্মিতা

ঢাকা , ১৯ মে, (ডেইলি টাইমস২৪):

মহিমান্বিত রমজান একজন মুমিনের জন্য তার শারীরিক, আর্থিক, চারিত্রিক ও মানবিকতার নানা বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ এবং নানা গুণের উত্কর্ষ সাধনের মাস। এ মাস হলো সহমর্মিতার অনুশীলনের মাস। সমাজে পারস্পরিক প্রীতি-ভালোবাসা ও আচার-আচরণগুলোর সুন্দর আদানের মাধ্যমে একটি ঈমানি সৌধ তৈরি হয়।

রমজানে ব্যক্তির আত্মিক ও আমলি উন্নতি ও অগ্রগতির পাশাপাশি সামাজিক কিছু দায়বদ্ধতার কথা রমজান শুরুর আগেই রাসুল (সা.) সাহাবাদের বলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এ (রমজান) মাস হলো সহমর্মিতার মাস।’ (শুয়াবুল ঈমান, হাদিস : ৩৩৩৬)। ওই হাদিসের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, ধনী গরিবের প্রতি, সক্ষম অক্ষমের প্রতি, পেট পুরে খাওয়া ব্যক্তি ক্ষুধার্ত ব্যক্তির প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করবে, এটি এ মাসের বড় শিক্ষা। পবিত্র রমজান মাসের আর অল্প কয়টি দিন বাকি। এখনই সময় অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়ে অফুরন্ত সাওয়াব অর্জন করা। পবিত্র এই মাসে অনেক ধরনের কাজ করেই মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। নিম্নে এমন কয়েকটি ফজিলতপূর্ণ কাজ তুলে ধরা হলো।

অন্যকে ইফতার করানো : রোজাদারকে ইফতার করালে রোজার সমান সওয়াব অর্জিত হয়। হজরত জায়েদ বিন খালিদ জুহানি (রাজি.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমান সওয়াব লাভ করবে। তবে (এর কারণে) রোজাদারের সওয়াব বিন্দু পরিমাণও হ্রাস পাবে না। (তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)

বিধবা ও এতিমের প্রতি দয়াশীল হওয়া : ইসলামী শরিয়তের বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি এতিম-বিধবা ও অসহায়দের অধিকারকে সংরক্ষণ করেছে। সমাজ এদের প্রতি অবহেলার চোখ ফেললেও ইসলাম তাদের হৃত অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছে।

একদা এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে নিজের অন্তরের কঠোরতার অভিযোগ করল। নবীজি বললেন, তুমি কি চাও তোমার হৃদয় কোমল হোক এবং তোমার প্রয়োজনও পূরণ হোক? বললেন, এতিমের প্রতি দয়া দেখাও। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। খাবারে তোমার অংশ হতে কিছু তাকে দাও; দেখবে, তোমার হৃদয়ে কোমলতা এসেছে এবং তোমার প্রয়োজনও পূরণ হয়েছে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৭৫৬৬)

অন্য হাদিসে বিধবাদের প্রতি দয়াপরবশ হওয়ার ব্যাপারে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, বিধবা নারী ও অসহায়দের সাহায্যে এগিয়ে আসা ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কিংবা রাতে ইবাদতে এবং দিনে রোজা পালনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে। (বুখারি, হাদিস : ৫০৩৮)

ক্ষুধার্তকে খাবার প্রদান : বিশ্বব্যাপী করোনায় আজ অনেক মানুষই কর্মহীন। আত্মসম্মানবোধের কারণে নিজেদের অসহায়ত্বের অবস্থা কাউকে বলতে পারে না। ক্ষুধা যন্ত্রণায় দিনাতিপাত করছে। এদের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করা। হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাও, ক্ষুধার্তকে খাওয়াও এবং বন্দিকে মুক্তি পেতে সহায়তা কর। (বুখারি, হাদিস : ৫৬৪৯)

প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া : ইফতার কিংবা সাহিরতে মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীকে ভাগ দেওয়া। আর অসহায় হলে তো সেই দায়িত্বটা আরো বেড়ে যায়।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) কে আমি বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে তৃপ্তিসহকারে আহার করে, সে মুমিনদের দলভুক্ত নয়। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১১১)

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানো : করোনার এই কঠিন সময়ে মানুষের জীবনে নানা বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নিজেদের অন্নের ব্যবস্থা করা যেখানে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে, সেখানে সময়মতো বাসাভাড়া পরিশোধ করা অনেকের জন্যই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাই এদের সঙ্গে ছাড়ের আচরণ দেখানো উচিত।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো সামর্থ্যহীন ব্যক্তির সঙ্গে (পাওনা আদায়ে) নম্র ব্যবহার করবে; আল্লাহ তাআলা দুনিয়া আখেরাত উভয় স্থানে তার সঙ্গে নম্রতা দেখাবেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৬৯)

অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া : একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের যে পাঁচটি (কোনো হাদিসের বর্ণনায় ছয়টি) হকের কথা উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি অধিকার রয়েছে : ১. সালামের জবাব দেওয়া, ২. অসুস্থের সেবা করা, ৩. জানাজায় শরিক হওয়া, ৪. দাওয়াত কবুল করা ও ৫. হাঁচির উত্তর দেওয়া। (বুখারি, হাদিস : ১২৩৯)

মজলুমকে সাহায্য করা : রমজান মাসে কেউ কেউ নানাভাবে জুলুমের শিকার হয়। তাদের রক্ষার জন্য এগিয়ে আসা। আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত তার বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার দ্বিনি ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকে। (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)

বিপদে অন্যকে সাহায্য করা : রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেয়; তো আল্লাহ তাআলার কেয়ামত দিবসে দূরকারীর মুসিবতকে দূর করে দেবেন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৪২)

অধীনদের কাজের চাপ কমিয়ে আনা : সালমান ফারসি (রা.) হতে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসের একটি অংশ হলো, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধীন ব্যক্তিদের কর্মভার লাঘব করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে মাগফিরাত ও ক্ষমার পুরস্কারে ভূষিত করবেন এবং জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি দান করবেন। (শুয়াবুল ঈমান, হাদিস : ৩৩৩৬)

অন্যকে খাওয়ানো : হাদিসে এসেছে, নিশ্চয়ই জান্নাতে অনেক (আলোকভেদ্য) কক্ষ রয়েছে, যার অভ্যন্তর থেকে বহিরাংশ এবং বহিরাংশ থেকে অভ্যন্তর দেখা যাবে। উপস্থিত সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এসব কার জন্য? রাসুল (সা.) বললেন, যে তার কথাকে সুন্দর করেছে, অপরকে খাইয়েছে, ধারাবাহিকভাবে রোজা রেখেছে এবং মানুষের নিদ্রাকালীন সময়ে সে নামাজে কাটিয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৮৪)

সদকায়ে ফিতর আদায় করা : ইবনে ওমর (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) রমজানে সদকায়ে ফিতরকে নির্ধারণ করেছেন। (বুখারি, হাদিস : ১৪০৭)

দুটি হিকমত সামনে রেখে এটিকে নির্ধারণ করা হয়েছে, একটি হলো, রোজাদার রোজাকালীন যেসব অনর্থক কাজ ও কথা বলেছে, সেসবের কাফফারা স্বরূপ নিজেদের পরিচ্ছন্নতার জন্য এ বিধান।

দ্বিতীয় হলো, গরিব ও অসহায়কে দান করা এবং ঈদের আনন্দে তাদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) রোজাদারের অনর্থক ও অশ্লীল কর্মকাণ্ডের কাফফারা হিসেবে এবং দরিদ্রদের অন্ন হিসেবে সদকায়ে ফিতর নির্ধারণ করেছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৯)

জাকাত আদায়ের মাধ্যমে এগিয়ে আসা : ইসলামের পাঁচটি রোকনের একটি হলো জাকাত প্রদান করা। নিজেদের সম্পদের অতিরিক্ত অংশ প্রদানে সামর্থ্যবানদের জন্য এটি ফরজ হুকুম। কারো রমজান মাসে বা তার আগে-পরের কাছাকাছি সময়ে জাকাত ফরজ হয়ে থাকলে এ রমজানকেই জাকাত আদায়ে নির্বাচিত করা। কারণ এ মাসে প্রতিটি আমলের সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কা।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button
Close