লিড নিউজশিক্ষা

যে পদ্ধতিতে এইচএসসিতে সবাই পাস

ঢাকা, ০৮ৃ অক্টোবর(ডেইলি টাইমস২৪): এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষার সব প্রস্তুতি অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছিল। আট মাস আগে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রশ্নপত্র ছেপে জেলায় জেলায় ট্রেজারিতে পাঠানো হয়। প্রস্তুত ছিল ১৪ লাখ পরীক্ষার্থীও। তবে বাদ সাধে করোনাভাইরাস। কভিড-১৯ সংক্রমণজনিত এ পরিস্থিতিতে এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষা বাতিল করছে সরকার। পরীক্ষার্থীদের ‘জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট’ (জেএসসি) ও ‘সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট’ (এসএসসি) ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গতকাল বুধবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এ বছর সবাই পাস করবে।

পরীক্ষা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। কেউ কেউ এ সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। আবার প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষা দিতে না পারায় কারও কারও কণ্ঠে হতাশার সুর বেজে উঠেছে। নানারকম বক্তব্য থাকলেও এ সিদ্ধান্তকে যথাযথই মনে করছেন অভিভাবক ও শিক্ষকরা। তারা বলছেন, পরীক্ষা হবে কি হবে না, কবে হবে- এসব নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা এ সিদ্ধান্তের কারণে কেটে গেল।

এর আগে এ বছরের জেএসসি ও প্রাথমিক সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষাও করোনার কারণেই বাতিল করা হয়।

শিক্ষামন্ত্রী গতকাল জানিয়েছেন, ‘২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা সরাসরি না নিয়ে ভিন্ন পদ্ধতিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ পরীক্ষার্থীরা এরই মধ্যে দুটি পাবলিক পরীক্ষা অতিক্রম করে এসেছে। তাদের জেএসসি ও এসএসসির ফলের গড় অনুযায়ী এইচএসসির ফল নির্ধারণ করা হবে।’

তিনি জানান, যারা এইচএসসিতে বিভাগ পরিবর্তন করেছে, তাদের মূল্যায়নের জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটি করা হয়েছে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে বিভাগ পরিবর্তনকারী শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে এইচএসসির চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষ করা হবে। যাতে জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে পরীক্ষা হবে, না ফলের ভিত্তিতে হবে, তা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই ঠিক করবে।

গত ১ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল, যাতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল প্রায় ১৪ লাখ পরীক্ষার্থীর। কিন্তু দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও আটকে যায়।

এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, ‘এইচএসসিতে পরীক্ষা ছাড়া মূল্যায়ন করার একটা সম্ভাবনা তো থেকেই যাচ্ছে। আমরা সেটাকে নাকচ করে দিচ্ছি না। আমাদের অন্য অপশনও আছে।’

সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় পরীক্ষা ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। তারা পূর্ণমান কমিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে মন্ত্রণালয়কে।

এ সংবাদ সম্মেলনের বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে মন্ত্রীকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ‘অনেক কিছুই হতে পারত। কী হতে পারত তা এখন ভাববার সময় নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ভালো কী করতে পারি সেই চেষ্টা আমরা করছি।’
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘গতবার যারা ফেল করেছে, তাদেরও জেএসসি ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।’
‘এইচএসসি পরীক্ষার আগে অনুষ্ঠিত টেস্ট পরীক্ষার ভিত্তিতে কেন মূল্যায়ন করা হচ্ছে না’- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরীক্ষায় যত ভালো প্রস্তুতি থাকে, টেস্টে অত ভালো প্রস্তুতি থাকে না। এই মুহূর্তে টেস্টের ফল নিতে গেলে নানা সমস্যা হতে পারে। সে কারণে জেএসসি ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে এই ফল দিতে যাচ্ছি।’

মন্ত্রী বলেন, কভিড-১৯ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তার নিশ্চয়তা নেই। কখন পরীক্ষা নেওয়া যাবে বলা কঠিন। পরীক্ষা নিতে ৩০ থেকে ৩২ কর্মদিবস প্রয়োজন হবে। কভিড পরিস্থিতিতে এক বেঞ্চে দু’জন বসানো সম্ভব নয়। প্রশ্নের নতুন প্যাকেট করারও সুযোগ নেই। বিষয় কমানো হয়তো যায়, কিন্তু প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্ম রয়েছে। আবার কভিড আক্রান্ত হলে তখন কী হবে- এ নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। ভারতের পরীক্ষাও আমরা দেখেছি। তিনটি পরীক্ষা নেওয়ার পর তাদের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। অনেক দেশেই পরীক্ষা বাতিল বা স্থগিত করেছে।

‘যেসব শিক্ষার্থী গ্রুপ পরিবর্তন করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন, তাদের মূল্যায়ন কীভাবে হবে’- এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, এটি ঠিক করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে ওই কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের প্রতিনিধি এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা থাকবেন। কমিটি মূল্যায়নের পদ্ধতি বের করে আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সরকারের কাছে মতামত দেবে। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই বিভাগ পরিবর্তনকারী শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে।
মন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক প্রমুখ।

দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৯ জন পরীক্ষার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৭৯ হাজার ১৭১ জন। অনিয়মিত পরীক্ষার্থী রয়েছেন দুই লাখ ৬৬ হাজার ৫০১ জন। এক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ এক লাখ ৬০ হাজার ৯২৯ জন, দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ ৫৪ হাজার ২২৪ জন এবং সব বিষয়ে অনুত্তীর্ণ ৫১ হাজার ৩৪৮ জন এবার পরীক্ষার্থী রয়েছেন। নিয়মিত-অনিয়মিত পরীক্ষার্থীর বাইরে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী রয়েছেন তিন হাজার ৩৯০ জন। মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থী রয়েছেন ১৬ হাজার ৭২৭ জন।
সবাই পাস :জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ভিত্তিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এবার কোনো ফেল থাকছে না, সবাই পাস করছে। সবাইকে পাস করানো হবে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘অবশ্যই সবাই পাস করবে। তবে ফলটা কী হবে সেটা নির্ভর করছে সংশ্নিষ্ট পরীক্ষার্থীর জেএসসি ও এসএসসির পরীক্ষার ফলের ওপর।’
গতবারের ফেল করা সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীকেও এ বছর একইভাবে মূল্যায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এই মূল্যায়নের কাজ করবে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি। বিভাগ পরিবর্তনজনিত (যারা বিজ্ঞান থেকে মানবিক বা অন্য বিভাগ পরিবর্তন করেছে) কারণে সৃষ্ট সমস্যা কাটাতেও বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করবে। এই বিশেষজ্ঞ কমিটি নভেম্বর মাসে তাদের পরামর্শ বা মতামত দেবে। এরপর ডিসেম্বরে এই মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করা হবে।

খুশি প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা :সরকারের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা। একাধিক অধ্যক্ষ বলেন, সিদ্ধান্তটি শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হয়েছে। রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, কবে পরীক্ষা হবে না হবে, সেসব নিয়ে এখন সব অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। করোনায় উন্নত দেশে অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা হলেও আমাদের দেশে এখনও তা সম্ভব নয়। অনলাইনে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরীক্ষা নিতে গিয়ে আমরা দেখেছি শিক্ষার্থীরা দেখে দেখে লিখে খাতা জমা দেয়। তার চেয়ে এই সিদ্ধান্ত ভালো। তিনি বলেন, অভিজ্ঞতায় দেখেছি একজন শিক্ষার্থীর এসএসসি ও এইচএসসির ফলে খুব একটা ফারাক হয় না। খুব কম শিক্ষার্থীর ফল আগেরবারের চেয়ে উন্নত হয়। কারও কারও আবার অবনতিও হয়। এ সিদ্ধান্ত থেকে মনে হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের পক্ষেই সমাধান হয়েছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফওজিয়া রেজওয়ান বলেন, শিক্ষার্থীদের সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এই সিদ্ধান্তের কারণে কেটে গেল। অনেক অভিভাবক সন্তানকে করোনার মধ্যে পরীক্ষা হলে পাঠাতে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

ঢাকা, ০৮ৃ অক্টোবর(ডেইলি টাইমস২৪)/আর এ কে

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button