মুক্তমত

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস

ঢাকা, ৩০ অক্টোবর(ডেইলি টাইমস২৪): ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের পুণ্য স্মৃতিময় দিন আজ ১২ রবিউল আউয়াল। সৌদি আরবের মক্কা নগরে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের একই দিনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। বাংলাদেশে দিনটি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) নামে পরিচিত।
হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে নবীজির (সা.) জন্ম। এ মাসেই তাঁর ওফাত। জন্ম ও ওফাতের তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের ভিন্নমত আছে। আমাদের দেশে রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ নবীজির জন্মদিন বলে স্বীকৃত।
১২ রবিউল আউয়ালকে অশেষ পুণ্যময় ও আশীর্বাদধন্য দিন হিসেবে বিবেচনা করেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। আরব জাহান যখন পৌত্তলিকতার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল, তখন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন মহান আল্লাহ।
বিশ্ব জগতের একচ্ছত্র মালিক ও পালনকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালার জন্য সকল প্রশংসা, যিনি মানব জাতির হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। শেষ নবী হিসাবে আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে প্রেরণ করে তার অনুকরণের মাধ্যমে তাকে ভালবাসার নির্দেশ দিয়েছেন।
দরূদ ও সালাম প্রেরণ করছি মানবতার মুক্তির দূত, রাহমাতুল্লিল আলামিনের প্রতি, যার আনুগত্য ও ভালবাসা আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা ও ভালবাসা লাভের মাধ্যম। শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক সকল সাহাবায়ে কেরামের প্রতি যারা ছিলেন রাসূলের (সা.) ভালবাসার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় এবং সকল তাবেয়িন ও তাবে তাবেয়িনসহ কেয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মুসলিম উম্মাহর প্রতি।
আরবি মাস সমূহের মধ্যে রবিউল আউয়াল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেননা এ মাসে সাইয়েদুল আম্বিয়ায়ে ওয়াল মুরসালিন খাতামুন নাবীয়্যিন এ ধরাপৃষ্ঠে আগমন করেন।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই ‘আল-আমিন’ নামে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর এই খ্যাতি ছিল ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ও সত্যবাদিতার ফল। তাঁর মধ্যে সম্মিলন ঘটেছিল সমুদয় মানবীয় সদ্‌গুণের: করুণা, ক্ষমাশীলতা, বিনয়, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, শান্তিবাদিতা। আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি কর্মময়তাও ছিল তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
নবীর জন্ম দুনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁকে নিয়ে দুনিয়ায় স্বতন্ত্র কোনো জাদুঘর নেই আজও। নেই তাঁর কোনো ভাস্কর্য, মূর্তি বা ছবি। তবু কী এক পাগলকরা ভালোবাসায় মুসলমানদের হৃদয়ে তাঁর স্থান। পৃথিবীতে এমন দ্বিতীয় মানবজনমের নজির নেই।
পবিত্র কোরআনে নবীজির প্রতি মুসলমানদের এই ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে এভাবে, ‘নবী বিশ্বাসীদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও বেশি আপনজন এবং নবীর স্ত্রীগণ তাদের মাতা।’ (সুরা আল আহজাব, আয়াত: ০৬)
একেকজন বেদুইন আরবকে নবীজি সভ্যতা শিখিয়েছেন। ধৈর্য, প্রজ্ঞা আর ভালোবাসা দিয়ে জয় করে নিয়েছেন খোলা তরবারি হাতে খুন করতে আসা রাগী যুবক উমরের (রা.) হৃদয়। দাস হিসেবে নামানুষী জীবন কাটানো বেলাল তাঁর স্পর্শে এসে হয়ে গেলেন হাদিসশাস্ত্রের সেরা পণ্ডিত। হাবশি গোলামের মর্যাদা হয়ে গেল আকাশছোঁয়া। ভয়ংকর যোদ্ধা আলী (রা.) তাঁর স্পর্শ থেকে শিখলেন যুদ্ধের ময়দানেও ব্যক্তিগত আক্রোশকে কীভাবে প্রশ্রয় না দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে জয় করতে হয়। লড়াইরত অবস্থায় ভূপাতিত শত্রু যখন আলীর মুখে থুতু ছিটিয়ে দেয়, তিনি তখন অস্ত্র ছেড়ে তাকে মুক্তি দিয়ে দেন। এমন উদারতা আগে কখনো দেখেনি দুনিয়া।
তায়েফের ময়দানে রক্তাক্ত হয়েও প্রার্থনা করেছেন তাদের সুবুদ্ধির জন্য যিনি—তিনি নবী মুহাম্মদ (সা.)। অথচ পুরো তায়েফ ভূমিকে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল তাঁর হাতে। যারা উহুদের যুদ্ধে তাঁর দাঁত ভেঙে দিয়েছিল অথবা তাঁকে মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য করেছিল, নবীজি মক্কা জয়ের পর তাদেরই উদারভাবে ক্ষমা করেছিলেন। এমন উদারতা এর আগে কোনো বিজেতা দেখিয়েছিলেন?
শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) নির্জন হেরা গুহায় যে আলোর দেখা তিনি পেয়েছিলেন, সেই আলোর বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন ঘরে ঘরে। এর জন্য সব ধরনের নির্যাতন তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। আল্লাহ তাঁর এই প্রিয় বান্দাকে সাফল্য দিয়েছেন। ওফাতের আগে তিনি দেখে গেছেন হাজার হাজার অনুসারী তাঁর জন্য জীবন দিতে তৈরি।
জন্মের ১৪০০ বছর পর আজও তাঁকে নিয়ে লেখা চলছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। শুধু মুসলমানদের মধ্যে যে তিনি প্রিয় তা নয়, দুনিয়ার বহু অমুসলিম তাঁকে হৃদয় উজাড় করে আজও ভালোবেসে চলেছে। মানবসভ্যতার জন্য তাঁর যে অবদান, অন্ধ না হলে তা কি অস্বীকার করা যায়!
বিশ্বের প্রভাবশালী শত মনীষীকে নিয়ে লেখা বই ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ সর্বোচ্চ প্রভাবশালী ও মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে সর্বাগ্রে রাখা হয়েছে নবীজিকে। লেখক ড. মাইকেল এইচ হার্ট জন্মগতভাবে একজন খ্রিষ্টান এবং শিক্ষাগত দিক থেকে একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। তবু ঈসাহ মসিহ (আ.) বা নিউটনকে প্রথম স্থানটি না দিয়ে নিরপেক্ষভাবে তিনি প্রথম স্থানটি দিয়েছেন নবী মুহাম্মদ (সা.)–কে। লিখেছেন, ‘তিনি ছিলেন ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ উভয় স্তরেই সর্বোচ্চ সফল।’ এই এক লাইনের বক্তব্যে মাইকেল এইচ হার্ট তাঁর ওপর আরোপিত সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছেন। আরেক ইংরেজ ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইল তাঁর On Heroes, ‘Hero Worship and The Heroic in History’ (London, 1841) বইয়ে নবীজিকে মানবসভ্যতার ‘নায়ক’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
জার্মান কবি গ্যেটে (১৭৪৯-১৮৩২) হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর ওপর দীর্ঘ কবিতা লিখে গেছেন। শেখ সাদির গুলিস্তাঁর জার্মান অনুবাদ গ্যেটেকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৮১২ সালে হাফিজের জার্মান অনুবাদ হলে গ্যেটে ইসলামে প্রজ্ঞা, নিষ্কলুষতা এবং শান্তি দেখতে পান। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যের এগুলোর খুব দরকার ছিল।
জীবন চালানোর জন্য বেঁচে থাকাবস্থায় মানুষ যেভাবে মুদ্রা নিয়ে ঘোরে, রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয় সেভাবে পকেটে নিয়ে ঘুরতেন নবীজির বাণী। দার্শনিক লিও তলস্তয়ের মৃত্যুর পর তাঁর ওভারকোটের পকেটে পাওয়া গিয়েছিল নবীজির ৪৫১টি নির্বাচিত হাদিসের সংকলন।
ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে বিশ্বমানবতার মুক্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর ব্রত। ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়নির্বিশেষে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক গুণাবলির মানুষ হিসেবে তিনি সব কালে, সব দেশেই স্বীকৃত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যা যা করেছেন, সবই সুন্নাত। ‘সুন্নাত’ হলো নবী কারিম (সা.) যে অবস্থায় যে কাজ যতটুকু গুরুত্বসহকারে করেছেন বা ছেড়েছেন, সে অবস্থায় সে কাজ ততটুকু গুরুত্বসহকারে করা বা ছাড়া। অনুরাগে নবীজির প্রতিটি কাজ অনুকরণ করা।
জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে নবীজি (সা.)–এর সুন্নাত আদর্শ অনুকরণ ও অনুসরণ করাই ইসলাম। কোরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রাসুল (সা.) তোমাদের যা দিয়েছেন তোমরা তা ধারণ করো আর তিনি যা বারণ করেছেন তা হতে বিরত থাকো।’ (সুরা-৫৯ হাশর, আয়াত: ৭)।
সুন্নাতের কথা যখন আসে ফরজ ও ওয়াজিব তার আগেই থাকে। ফরজ ও ওয়াজিব পরিত্যাগ করে সুন্নাত পালনের দাবি অসার। সৎ উপার্জন, হালাল খাবার ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। নবীজি (সা.)–এর জীবন, দর্শন ও কর্ম যে যতটুকু অনুসরণ করবে, সে ততটুকু সফলতা ও কল্যাণ লাভ করবে।
নবীজি (সা.)–এর ভালোবাসা মুমিনের ইমান; সুন্নাতের অনুসরণই ভালোবাসার প্রমাণ। কোরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(হে রাসুল!) আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তবে আমার অনুসরণ করো; ফলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন, তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (সুরা-৩, আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে আমার সুন্নাতকে ভালোবাসে, সে অবশ্যই আমাকে ভালোবাসে; আর যে আমাকে ভালোবাসে সে জান্নাতে আমার সঙ্গেই থাকবে।’ (তিরমিজি: ২৭২৬)। ‘যে আমার সুন্নাতকে জিন্দা করবে সে আমাকে ভালোবাসে, যে আমাকে ভালোবাসে সে জান্নাতে আমার সঙ্গেই থাকবে।’ (মুসলিম)। তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি (নবীজি সা.) তার নিকট তার সন্তান অপেক্ষা, তার পিতা অপেক্ষা এবং সকল মানুষ অপেক্ষা বেশি প্রিয় না হই।’ (বুখারি: ১৩-১৪)। ‘যে যাকে ভালোবাসবে, তার সঙ্গে তার হাশর নশর হবে।’ (বুখারি: ৬১৬৯ ৩৬৮৮, মুসলিম: ২৬৩৯)। হাদিসে আরও রয়েছে, ‘সর্বোত্তম আমল হলো আল্লাহর জন্য ভালোবাসা।’ (জামে সহিহ্: ২৫৩৯)। রাসুলে আকরাম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মহব্বত করে ও আল্লাহর জন্য ঘৃণা করে এবং আল্লাহর জন্য দান করে ও আল্লাহর জন্য বিরত থাকে; অবশ্যই তার ইমান পূর্ণ হলো।’ (আবুদাঊদ: ৪০৬৪)।
নিঃসন্দেহে মহানবী (সা.) কে ভালবাসা এবং তার প্রদর্শিত পথ অনুযায়ী জীবন-যাপন করা ঈমানের অংশ। এ প্রসঙ্গে ইমাম বুখারি (র.) বুখারি শরীফে স্বতস্ত্র একটি শিরোনাম এনেছেন। যার অর্থ ‘নবী (সা.) এর ভালবাসা ঈমানের অঙ্গ’। বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আনাস (রাজিআল্লাহু তায়ালা আনহু) ও আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) বলেন, ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার নিকট নিজ নিজ পিতা-মাতা, সন্তান ও সকল মানুষ হতে প্রিয় না হই। (বুখারি)
আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর জন্য কারো সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করল, আল্লাহর জন্য শত্রুতা পোষণ করল, আল্লাহর জন্য কাউকে দান করল এবং আল্লাহর (সম্পদ) ব্যয় করা থেকে বিরত থাকল, নিশ্চয়ই সে স্বীয় ঈমানকে পরিপূর্ণ করল । (তিরমিজি ও আবু দাউদ)
হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ভালবাসাকে অপরাপর ভালবাসার উর্ধ্বে স্থান দেয়া এবং শত্রুতা ও মিত্রতায় আল্লাহ ও তার রাসুলের হুকুমের অনুগত থাকা ঈমানের পূর্ণতা লাভের পূর্বশর্ত।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, (হে নবী)! আপনি বলুন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা-মাতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই-বোন, তোমাদের বংশ, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের এমন ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ কর; আল্লাহ তায়ালা ও তার রাসুল এবং তার রাস্তায় জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় না হয়, তাহলে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না। (সুরা তওবা, আয়াত ২৪)
আয়াতের মর্ম হলো যারা দুনিয়াবি সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসুলের সম্পর্ককে উপেক্ষা করেছে তাদের করুণ পরিণতির দিন সমাগত। দুনিয়ার মধ্যেই সে আজাব আসতে পারে। তবে আখেরাতের আজাব অবশ্যই ভোগ করতে হবে।
উল্লেখিত আয়াতে সকল মুসলিমের প্রতি এ আদেশ দেয়া হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালবাসা এমন উন্নত স্তরে রাখা ওয়াজিব, যে স্তরে অন্য কারো ভালবাসা স্থান পায় না। তাই যার ভালবাসা এ স্তরে নেই সে শাস্তির যোগ্য।
তাই মুসলিমগণ আন্তরিকভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান ও ভালবাসাকে ওয়াজিব মনে করে। নিচে এ বিষয়ে কতিপয় নির্দেশনা উল্লেখ করা হল।
১. রাসুল (সা.) এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর অত্যাবশ্যক করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা কোন ব্যাপারেই আল্লাহ ও তার রাসুলের সামনে অগ্রণী হয়ো না। (সুরা হুজুরাত : আয়াত ১) এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয়, রাসুল (সা.) এর অবর্তমানে তাঁর আনীত শরিয়ত ও আল্লাহর হুকুমের সামনে কারো কোন মত বা পথ গ্রহণযোগ্য হবে না।
২. আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের ওপর রাসুল (সা.) এর আনুগত্য ও ভালবাসাকে ফরয করে বলেন, (হে নবী!) আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার আনুগত্য কর। ফলে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ মাফ করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১) যার আনুগত্য করা ওয়াজিব তার বিরোধিতা বা অবাধ্যতা করা হারাম। সমস্ত কাজে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যক।
৩. আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) কে নেতা ও বিচারক রূপে পাঠিয়েছেন। এ মর্মে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাজিল করেছি, যাতে আপনি সে অনুসারে মানুষের মাঝে বিচার মিমাংসা করেন যা আল্লাহ আপনাকে জানিয়েছেন । (সুরা আন নিসা, আয়াত ১০৫)
৪. আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলের মহব্বতকে ফরজ করে দিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেন, সে সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ আমি তাঁর পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষ হতে অতি প্রিয় না হই। (বুখারি শরিফ) । যাকে ভালবাসা ওয়াজিব, তাকে সম্মান করাও ওয়াজিব।
৫. আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রাসূল (সা.) কে সর্বোত্তম সিরাত-সুরাত, সর্বগুণে গুণান্বিত, সৃষ্টির সেরা ও সর্বোৎকৃষ্ট মানব হিসাবে নির্বাচন করেছেন। এমন চরিত্র ও সৌন্দর্যের অধিকারীকে সম্মান প্রদর্শন করা অবশই জরুরি।
সত্যিকারার্থে রাসুল (সা.) এর ভালবাসার অর্থ হলো, তিনি যে সকল গুণে গুণান্বিত ছিলেন সেগুলোর চর্চা করা ও নিজের মাঝে সেগুলোর বাস্তবায়ন করা এবং যে সকল বিষয় তিনি পরিহার করেছেন ও পরিহার করতে বলেছেন তা পরিহার করা।
এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রাসুল (সা.) এর আনীত দ্বীনকে তোমরা আকড়ে ধর, আর যা তিনি নিষেধ করেছেন তা পরিহার কর। (সুরা আল হাশর, আয়াত ৭) রাসুল (সা.) এর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা পরকালে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মাঝে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। (সুরা আল আহযাব, আয়াত ২১)
রাসুল (সা.) এর আদর্শ ও গুণাবলী সম্পর্কে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাজিআল্লাহু তায়ালা আনহা) বলেন, রাসুলের চরিত্র হল আল কোরআন। অর্থাৎ কোরআনে বর্ণিত সকল গুণাগুণ যেমন সততা, ন্যায় পরায়ণতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, কোমল স্বভাব, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, এতিম-অসহায় ও বিধবাদের সহায়তা করা, গৃহ পরিচারিকা, খাদেম, অধিনস্ত, স্ত্রী, পরিবার, পরিজনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া রাসুল (সা.) এর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছিল।
তাই আমাদের উচিত রবিউল আউয়াল মাসে রাসুলের (সা.) ভালবাসাকে সীমিত না রেখে বছরের প্রতিটি দিনে, প্রতি ক্ষণে, প্রতি মাসে এক কথায় জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে সুন্নাতের অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর রেখে যাওয়া জীবনাদর্শকে বাস্তবায়ন করা।
কোরআন ও হাদিসে প্রত্যেকটি বিষয় যেভাবে এসেছে এবং রাসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামগণ যেভাবে আমল করেছেন বা করতে বলেছেন সেভাবে করা বা মেনে নেয়ার নামই হল ইবাদত। এতে কোন ধরনের বাড়াবাড়ি করাকে শরিয়ত সমর্থন করে না। এমনিভাবে রাসুল (সা.) এর ভালবাসার ব্যাপারে রাসুল (সা.) যেভাবে ভালবাসতে বলেছেন বা সাহাবায়ে কেরামগণ যেভাবে ভালবাসা দেখিয়েছেন সেভাবে ভালবাসাই হল ইবাদত। এতে কোন ধরনের বাড়াবাড়ি করা শরিয়ত সমর্থন করে না। পাশাপাশি রাসুল (সা.) এ ব্যাপারে নিষেধও করেছেন।
তিনি বলেছেন, খ্রিস্টানরা যেমনভাবে ঈসা ইবনে মারয়ামের (আলাইহিমাস সালাম) ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা তেমনিভাবে আমার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর বান্দা, অতএব তোমরা বল আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। (বুখারি ও মুসলিম)
এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার অর্থ হল রাসুল (সা.) এর মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যাবলীর ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন ও সীমালঙ্ঘন করা। যেমন রাসুল (সা.) কে হাজির নাজির বলা, তিনি নূরের তৈরি, তিনি গায়েব জানেন, তার নামে কসম খাওয়া, তার নামে মান্নত করা, তার নিকট দোয়া ও আশ্রয় প্রার্থনা করা ইত্যাদি আল্লাহর গুণ সমূহে গুণান্বিত করা। এসবই রাসুল (সা.) এর সৌজন্য এ ধরনের কার্যকলাপ শরিয়তে গর্হিত। তাই এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকব।
সাহাবায়ে কেরামের (রাজিআল্লাহু তায়ালা আনহুম) নবী (সা.) এর প্রতি ভালবাসা ছিল নজিরবিহীন। যারা হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে রাসূলের (সা.) থুথু হাতে মুখে মেখেছিলেন এবং উহুদ প্রান্তরে তালহা (রা.) নিজেকে রাসুল (সা.) এর ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তাতে তার দেহে ৭০টি তীরের আঘাত লেগেছিল। এ ছাড়াও সাহাবায়ে কেরামের নবী প্রেমের অসংখ্য ঘটনা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। তারা কোন দিন এ ধরনের বাহ্যিক সাজ-সজ্জা, আড়ম্বরতা, মুখরোচক শ্লোগান ও লৌকিকতাপূর্ণ মাসিক বা বার্ষিক প্রথা হিসাবে কোন অনুষ্ঠান পালন করেন নি। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা রাসূলের জীবনাদর্শ অনুসরণ করেছেন। ভালবাসার ক্ষেত্রে তাদের মত সুন্নাতের অনুকরণ ও আদর্শে আদর্শবান হওয়ায় ইবাদত ও সাওয়াবের কাজ।
এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা ঈমান আন যেমনি ঈমান এনেছেন মানুষগণ অর্থাৎ সাহাবাগণ। (সুরা আল বাকারা, আয়াত ১৩) সুতরাং তাদের ঈমান ও আমল অনুযায়ী আমাদের ঈমান ও আমল হওয়া উচিত। তাদের ঈমান ও আমলের প্রতি আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে বলেন, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর দলের অন্তুর্ভুক্ত। জেনে রেখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে। (সুরা মুজাদালাহ, আয়াত ২২)
মহানবী (সা.)-এর সুমহান আদর্শ অনুসরণের মধ্যেই মুসলমানদের অফুরন্ত কল্যাণ, সফলতা ও শান্তি নিহিত রয়েছে।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, কলামিষ্ট, সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ ।

ঢাকা, ৩০ অক্টোবর(ডেইলি টাইমস২৪)/আর এ কে

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button